বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তি নিরুৎসাহিত করে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। একই সঙ্গে বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়া হলেও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কঠোর শর্ত আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের কাছে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। আবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ সীমিত করা প্রয়োজন, কারণ এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আইপিওতে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
বিনিয়োগকারীরা তাদের আবেদনে উল্লেখ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্বল নীতিমালা এবং সুশাসনের ঘাটতির কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বর্তমান কমিশনের অধীনে বাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মানসম্পন্ন নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা করছেন তারা।
তাদের মতে, আইপিও পদ্ধতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য পুঁজিবাজারে প্রবেশের সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর মাধ্যম। বিশেষ করে নতুন বিনিয়োগকারী, শিক্ষার্থী, গৃহিণী এবং স্বল্প মূলধনের বিনিয়োগকারীরা আইপিওর মাধ্যমে ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগের সুযোগ পান।
আবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি, বেসরকারি বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বাজারে এলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। কারণ সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সাধারণত নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে কোম্পানি মূলধন সংগ্রহ করে না, বরং বিদ্যমান উদ্যোক্তা বা মালিকপক্ষ তাদের শেয়ার বিক্রির সুযোগ পান।
বিনিয়োগকারীরা ২০০৬ সালের পর সরাসরি তালিকাভুক্তির অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সরাসরি তালিকাভুক্ত হওয়া ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র দুটি সরকারি কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক রিটার্ন দিতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের আটটি প্রতিষ্ঠানের বর্তমান শেয়ারদর তালিকাভুক্তির সময়কার মূল্যের নিচে রয়েছে।
তাদের দাবি, এই অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, সরাসরি তালিকাভুক্তি দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি। তাই বেসরকারি কোম্পানির ক্ষেত্রে আইপিওভিত্তিক তালিকাভুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
বিনিয়োগকারীদের মতে, আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানি নতুন মূলধন সংগ্রহ করে। এই অর্থ ব্যবসা সম্প্রসারণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগে ব্যবহার করা যায়। এর ফলে কোম্পানি যেমন উপকৃত হয়, তেমনি অর্থনীতিতেও নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোম্পানির নিজস্ব তহবিলে নতুন অর্থ যোগ হয় না। বরং বিদ্যমান উদ্যোক্তা বা পরিচালকরা নিজেদের মালিকানাধীন শেয়ার বিক্রির সুযোগ পান। এ কারণে বেসরকারি কোম্পানির জন্য এ ধরনের তালিকাভুক্তি নীতিগতভাবে সীমিত করা উচিত বলে মনে করছেন তারা।
তবে জাতীয় স্বার্থে ব্যতিক্রমী কোনো পরিস্থিতিতে সরাসরি তালিকাভুক্তির অনুমতি দেওয়ার প্রয়োজন হলে কয়েকটি শর্ত আরোপের সুপারিশ করেছেন বিনিয়োগকারীরা। এর মধ্যে রয়েছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে থাকা অবশিষ্ট শেয়ারের ওপর পাঁচ বছরের বাধ্যতামূলক লক-ইন ব্যবস্থা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেয়ার হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা এবং কমিশনের কঠোর নজরদারি।
এ ছাড়া তারা প্রস্তাব করেছেন, কোনো কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির অনুমতি দেওয়া হলে তার পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ২০ শতাংশ শেয়ার বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়মিত নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার নীতিও অনুসরণ করা উচিত বলে আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তালিকাভুক্তির পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই পুঁজিবাজারে আলোচনা রয়েছে। একদিকে দ্রুত ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার প্রয়োজন রয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও সুরক্ষাও নিশ্চিত করা জরুরি।
তাদের মতে, পুঁজিবাজার শুধু বড় উদ্যোক্তাদের অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম নয়, এটি লাখো বিনিয়োগকারীর সঞ্চয় ও আস্থার জায়গা। তাই তালিকাভুক্তির নীতিতে এমন ভারসাম্য প্রয়োজন, যাতে কোম্পানি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পায় এবং একই সঙ্গে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অধিকারও সুরক্ষিত থাকে।
আবেদনে বিনিয়োগকারীরা সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে আইপিওভিত্তিক তালিকাভুক্তির নীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, এতে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের আস্থা শক্তিশালী হবে।

