বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর করপোরেট সুশাসন জোরদারে অন্তত একজন নারী স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হলেও দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও অর্ধেকের মতো প্রতিষ্ঠান এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
ফলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তৃতীয়বারের মতো সময়সীমা বাড়িয়ে আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নতুন সুযোগ দিয়েছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কবার্তাও দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বিএসইসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৮০টি প্রতিষ্ঠান অন্তত একজন নারী স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে। অর্থাৎ মোট কোম্পানির ঠিক অর্ধেক এই শর্ত পূরণ করেছে। অন্যদিকে ১৩১টি কোম্পানি অতিরিক্ত সময় চেয়েছে অথবা নিয়োগপ্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন করতে পারেনি। এছাড়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখনো তাদের পরিপালনসংক্রান্ত কোনো তথ্যই বিএসইসির কাছে জমা দেয়নি। ফলে মোট ১৮০টি কোম্পানি এখনো এ নির্দেশনার পূর্ণ বাস্তবায়নের বাইরে রয়েছে।
করপোরেট গভর্ন্যান্স বা সুশাসন শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল সরকারি গেজেটের মাধ্যমে করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড সংশোধন করে প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে অন্তত একজন নারী স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার বিধান বাধ্যতামূলক করা হয়। এর আগে এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না।
বিএসইসির কর্মকর্তাদের মতে, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য কেবল একটি প্রশাসনিক নির্দেশনা বাস্তবায়ন নয়। পরিচালনা পর্ষদে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বহুমাত্রিকতা সৃষ্টি হবে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে এবং স্বতন্ত্র পরিচালকদের তদারকি কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কমিশন কোম্পানিগুলোকে ব্যবসায়ী, করপোরেট নির্বাহী, ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসহ বিভিন্ন পেশার অভিজ্ঞ ও যোগ্য নারীদের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে।
তবে তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের দাবি, বাস্তবে যোগ্য নারী স্বতন্ত্র পরিচালক খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। তাদের মতে, আইন অনুযায়ী একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা আরও সীমিত হয়ে যায়। এছাড়া দায়িত্বের চাপ, আইনি দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত কারণে অনেক অভিজ্ঞ নারী পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হন না।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ বলেন, ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধেক কোম্পানি বিএসইসির নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছে। তবে বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরও সময় প্রয়োজন ছিল। তাঁর মতে, সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কোম্পানিগুলোর জন্য ইতিবাচক এবং তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্ত পূরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে ন্যূনতম দুইজন স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী এই সংখ্যা তিনজনে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ী সংগঠনের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি বাস্তবায়ন করা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এজন্য তারা প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে।
অন্যদিকে করপোরেট সুশাসন বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তাঁদের মতে, দেশে যোগ্য নারী পেশাজীবীর কোনো ঘাটতি নেই। ব্যাংক, বিমা, আইন, বিশ্ববিদ্যালয়, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি, জনপ্রশাসন এবং করপোরেট খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অসংখ্য নারী রয়েছেন, যারা দক্ষতার সঙ্গে স্বতন্ত্র পরিচালকের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল সমস্যা যোগ্য প্রার্থীর অভাব নয়; বরং অনেক পরিবারনিয়ন্ত্রিত কোম্পানি পরিচালনা পর্ষদে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন মতামত দিতে সক্ষম ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে অনীহা প্রকাশ করে। ফলে স্বতন্ত্র পরিচালকের ধারণাটি অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, পরিচালনা পর্ষদে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মেনে চলার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত করপোরেট সুশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি। গবেষণায় দেখা গেছে, বৈচিত্র্যময় পরিচালনা পর্ষদ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করে, কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, জবাবদিহি বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের টেকসই প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
বিএসইসির প্রত্যাশা, নতুন সময়সীমার মধ্যে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো প্রয়োজনীয় নিয়োগ সম্পন্ন করবে। এর মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারে করপোরেট সুশাসন আরও শক্তিশালী হবে এবং স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচালনা কাঠামো গড়ে উঠবে।

