পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত চারটি ব্যাংক ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক (এপ্রিল-জুন) এবং বছরের প্রথম ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত হিসাব বলছে, ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থায় এক ধরনের মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। প্রথম ছয় মাসের হিসাবে প্রাইম ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক শেয়ারপ্রতি মুনাফা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংক একই সময়ে মুনাফা কমার চাপের মুখে পড়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চারটি ব্যাংকের আর্থিক সূচকে মুনাফা, পরিচালন নগদ প্রবাহ এবং নিট সম্পদ মূল্যে ভিন্নধর্মী প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে পরিচালন নগদ প্রবাহের ক্ষেত্রে অধিকাংশ ব্যাংকই আগের বছরের তুলনায় দুর্বল অবস্থানে রয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে ব্যাংকটি শেয়ারপ্রতি ০.০৭ টাকা লোকসান করেছে, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ০.৯৮ টাকা মুনাফা হয়েছিল। বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় নেমে এসেছে ০.২২ টাকায়, যা এক বছর আগে ছিল ১.৮২ টাকা। একই সময়ে পরিচালন নগদ প্রবাহও ৩.৬০ টাকা থেকে ০.৭৪ টাকায় নেমে এসেছে। ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য দাঁড়িয়েছে ২৪.৩০ টাকা, যা গত বছরের শেষে ছিল ২৪.৩৫ টাকা। ব্যাংকটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রভিশনের আগের মুনাফা কমে যাওয়া, পরিচালন নগদ প্রবাহ হ্রাস এবং মোট শেয়ারহোল্ডার ইক্যুইটি কমে যাওয়ায় এসব সূচকে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
অন্যদিকে প্রাইম ব্যাংক তুলনামূলক ভালো ফল করেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় বেড়ে ১.৮৫ টাকা হয়েছে, যা আগের বছরের পুনর্নির্ধারিত হিসাবে ছিল ১.৬৪ টাকা। বছরের প্রথম ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৫৬ টাকা, যেখানে আগের বছর ছিল ৩.৩৬ টাকা। যদিও পরিচালন নগদ প্রবাহ ১৬.২৯ টাকা থেকে ৭.৫৫ টাকায় নেমে এসেছে, তবে নিট সম্পদ মূল্য বেড়ে ৩৯.০৩ টাকায় উন্নীত হয়েছে। এক বছর আগে এটি ছিল ৩৩.৬১ টাকা। ব্যাংকটির মতে, ঋণ গ্রহণের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে পরিচালন নগদ প্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে।
আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক দ্বিতীয় প্রান্তিকে কিছুটা ধীরগতি দেখালেও ছয় মাসের হিসাবে উন্নতি করেছে। এপ্রিল-জুন সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ০.৭২ টাকা, যা আগের বছরের ০.৭৮ টাকা থেকে সামান্য কম। তবে জানুয়ারি-জুন সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়ে ০.৮৬ টাকা হয়েছে, যেখানে আগের বছর ছিল ০.৮৩ টাকা। পরিচালন নগদ প্রবাহ ১৫.৮৯ টাকা থেকে ৭.৬৩ টাকায় নেমে এসেছে। তবে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য বেড়ে ২১.৮১ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ছিল ২১.১৬ টাকা। ব্যাংকটির দাবি, বিনিয়োগ আয় বাড়ায় মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আমানত প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকায় পরিচালন নগদ প্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে।
ঢাকা ব্যাংক দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইতিবাচক ফল দেখালেও ছয় মাসের হিসাবে পিছিয়েছে। এপ্রিল-জুন সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়ে ০.৩৮ টাকা হয়েছে, যা আগের বছরের পুনর্নির্ধারিত ০.২৯ টাকা ছিল। কিন্তু জানুয়ারি-জুন সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় কমে ০.৯৫ টাকায় নেমে এসেছে। আগের বছর একই সময়ে তা ছিল ১.০৯ টাকা। পরিচালন নগদ প্রবাহ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে এই ব্যাংকটির। এটি ২৩.০৯ টাকা থেকে ঋণাত্মক ১০.৪৩ টাকায় নেমে গেছে। তবে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য বেড়ে ২৩.৪৬ টাকা হয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ২২.৫৪ টাকা। ব্যাংকটির ভাষ্য, পরিচালন আয় কমে যাওয়া, আয়কর সংস্থান বৃদ্ধি এবং আমানত কমে যাওয়ার কারণে মুনাফা ও নগদ প্রবাহ—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সামগ্রিকভাবে চারটি ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুনাফার দিক থেকে দুই ব্যাংক এগোলেও পরিচালন নগদ প্রবাহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ প্রভিশন, আমানত প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, ঋণ কার্যক্রমে পরিবর্তন এবং বিনিয়োগ কাঠামোর প্রভাব ব্যাংকগুলোর আর্থিক সূচকে প্রতিফলিত হচ্ছে। ফলে আগামী প্রান্তিকগুলোতে ব্যাংকগুলোর তারল্য, মুনাফা এবং ঋণমানের ওপর বিনিয়োগকারীদের নজর আরও বাড়বে।

