তালিকাভুক্তির পর গত পাঁচ বছরে ব্যবসায়িক ও আর্থিক দিক থেকে চমকপ্রদ অগ্রগতি দেখিয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল ফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা। এই সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি, যা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ছিল একশ আশি কোটি টাকা, যা ২০২৫ সাল শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় নয়শ সাঁইত্রিশ কোটি টাকায়।
গতকাল রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্তির পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির আয় এবং পরিচালন মুনাফা উভয়ই প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী থেকেছে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। সে সময় কোম্পানিটির মোট আয় ছিল আট হাজার একশ বিয়াল্লিশ কোটি টাকা, যা পরবর্তী পাঁচ বছরে বেড়ে নয় হাজার নয়শ বিরানব্বই কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে পরিচালন মুনাফা তিন হাজার তিনশ আট কোটি টাকা থেকে বেড়ে চার হাজার নয়শ ঊনআশি কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
এই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির সুফল পৌঁছেছে শেয়ারহোল্ডারদের কাছেও। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ত্রিশ পয়সা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক টাকা ত্রিশ পয়সায়—অর্থাৎ সাড়ে তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি। একই সঙ্গে শেয়ারপ্রতি লভ্যাংশও পঞ্চাশ পয়সা থেকে বেড়ে এক টাকা আশি পয়সায় পৌঁছেছে। লভ্যাংশ বণ্টনের হারও এই সময়ে পাঁচ শতাংশ থেকে বেড়ে সতেরো দশমিক পাঁচ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
গ্রাহক সংখ্যার দিক দিয়েও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। গত পাঁচ বছরে দেশের টেলিকম খাতে নতুন যুক্ত হওয়া প্রায় ষাট লাখ গ্রাহকের একটি বড় অংশ, প্রায় পঁয়ষট্টি শতাংশ, একাই অর্জন করেছে এই অপারেটর। এর ফলে বাজারে তাদের গ্রাহক অংশীদারত্ব প্রায় ত্রিশ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে সম্পূর্ণ টেলিকম শিল্পের আয় বৃদ্ধির প্রায় পঁয়তাল্লিশ শতাংশও একাই অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি, যার ফলে বাজারে তাদের আয়ের অংশ বেড়ে প্রায় একত্রিশ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ডেটা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান শক্তিশালী। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে ডেটা বাজারে তাদের অংশীদারত্ব ছিল প্রায় তেতাল্লিশ শতাংশ, আর প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাতাশ হাজার সাতশ চৌষট্টি টেরাবাইট ডেটা ব্যবহৃত হতো তাদের নেটওয়ার্কে। গ্রাহকপ্রতি মাসিক গড় ডেটা ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—২০২০ সালে যেখানে তা ছিল প্রায় পৌনে তিন জিবি, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে আট জিবির কাছাকাছি।
চলতি বছরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মোট গ্রাহকের প্রায় আশি শতাংশই মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, যার মধ্যে নব্বই শতাংশের বেশি ফোরজি সংযোগ ব্যবহার করছেন। গ্রাহকদের প্রায় বাহাত্তর শতাংশের কাছে স্মার্টফোন রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের মোট আয়ের প্রায় চুয়াল্লিশ শতাংশ আসছে শুধু ডেটা সেবা থেকে, আর মোট রিচার্জের অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে।
অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তা তার বক্তব্যে বলেন, ভবিষ্যতে ব্যবসায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা আরও বাড়বে। তবে তালিকাভুক্তির পর থেকে এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি ছিল শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাইবার হুমকি মোকাবিলা এবং নৈতিক মানদণ্ড বজায় রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে তারা একটি শক্তিশালী তথ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করেছেন।
এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, দেশে ব্যবসার সার্বিক পরিবেশ আগের তুলনায় উন্নত হচ্ছে। তার মতে, বিভিন্ন নীতিগত জটিলতা ধীরে ধীরে দূর হওয়ার ফলে আগামী দিনে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করা যায়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের প্রকৃতিগত কারণেই এর ইতিবাচক প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হবে না, বরং তা প্রতিফলিত হতে কিছুটা সময় লাগবে। অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানের অর্থ বিভাগের প্রধান কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর গত পাঁচ বছরে এই টেলিকম প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অগ্রগতি শুধু নিজস্ব সাফল্যের প্রতিফলনই নয়, বরং দেশের টেলিকম খাতের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ডেটা ব্যবহারের ক্রমবর্ধমান হার এবং ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার ভবিষ্যতে এই খাতের প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

