দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে দেশের শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার আভাস মিললেও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে উল্টো দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত জুলাই মাসে দেশি, বিদেশি ও প্রবাসী—সব ধরনের বিনিয়োগকারীর বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সূচকের সাময়িক উন্নতি হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশে মোট বিও হিসাব রয়েছে ১৬ লাখ ৫২ হাজার ৩৬৫টি। জুন মাস শেষে এ সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৭৫ হাজার ২৫২টি। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে বিও হিসাব কমেছে ২২ হাজার ৮৮৭টি। জুলাই মাসে মোট ২৫ কার্যদিবস লেনদেন হওয়ায় প্রতি কার্যদিবসে গড়ে প্রায় ৯১৫টি হিসাব কমেছে।
বিও হিসাব হলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্রোকারেজ হাউস বা মার্চেন্ট ব্যাংকে খোলা বিনিয়োগকারীর হিসাব। এই হিসাব ছাড়া শেয়ার কেনাবেচা করা যায় না। তাই বিও হিসাবের সংখ্যা বাজারে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতিও কমেছে। বর্তমানে তাদের নামে বিও হিসাব রয়েছে ৪২ হাজার ৩টি, যা জুন শেষে ছিল ৪৩ হাজার ১৮৩টি। এক মাসে এ শ্রেণির হিসাব কমেছে ১ হাজার ১৮০টি। কার্যদিবস হিসেবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৭টি বিদেশি বা প্রবাসী হিসাব কমেছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এই ধারাবাহিক সরে যাওয়া নতুন নয়। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে তারা ক্রমাগত বাজারে অংশগ্রহণ কমিয়ে আসছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতেও এ প্রবণতা অব্যাহত ছিল। মার্চে কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও এপ্রিল মাসে আবার হিসাব কমে যায়। মে মাসে সামান্য বৃদ্ধি হলেও জুলাইয়ে ফের পতন হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ৫৫ হাজার ৫১২টি। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৪২ হাজার ৩টিতে। অর্থাৎ ওই সময়ের তুলনায় এখনো ১৩ হাজার ৫০৯টি হিসাব কম রয়েছে।
স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে দেশি বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও জুলাইয়ে বড় ধরনের পতন হয়েছে। বর্তমানে দেশি বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব রয়েছে ১৫ লাখ ৯২ হাজার ১৪৬টি, যা জুন শেষে ছিল ১৬ লাখ ১৩ হাজার ৭২৪টি। এক মাসে কমেছে ২১ হাজার ৫৭৮টি হিসাব।
তবে দীর্ঘমেয়াদি হিসাবে এখনো দেশি বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ২০২৫ সালের শেষের তুলনায় বেশি। ২০২৫ সালের শেষে দেশি বিও হিসাব ছিল ১৫ লাখ ৭৯ হাজার ২৩টি। সে হিসাবে সাম্প্রতিক পতনের পরও এখনো ১৩ হাজার ১২৩টি হিসাব বেশি রয়েছে।
সার্বিকভাবে বাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ২০২৪ সালের শুরুর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ২০২৪ সালের শুরুতে মোট বিও হিসাব ছিল ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫১টি। বর্তমানে তা ১৬ লাখ ৫২ হাজার ৩৬৫টিতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ আড়াই বছরেরও কম সময়ে বাজার থেকে ১ লাখ ২১ হাজার ১৮৬টি হিসাব কমে গেছে।
পুরুষ ও নারী—উভয় শ্রেণির বিনিয়োগকারীর সংখ্যাই কমেছে। বর্তমানে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব রয়েছে ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৫৬১টি। জুন শেষে এ সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৬২ হাজার ৭৮৯টি। ফলে এক মাসে পুরুষ বিনিয়োগকারীর হিসাব কমেছে ১৭ হাজার ২২৮টি।
নারী বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও পতন দেখা গেছে। বর্তমানে নারী বিও হিসাব রয়েছে ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৫৮৮টি, যা জুন শেষে ছিল ৩ লাখ ৯৪ হাজার ১১৮টি। অর্থাৎ এক মাসে নারী বিনিয়োগকারীর হিসাব কমেছে ৫ হাজার ৫৩০টি।
কোম্পানির নামে খোলা বিও হিসাবও কমেছে। বর্তমানে কোম্পানি বিও হিসাব রয়েছে ১৮ হাজার ২১৬টি, যা জুন শেষে ছিল ১৮ হাজার ৩৪৫টি। এক মাসে কমেছে ১৯২টি হিসাব।
একক ও যৌথ উভয় ধরনের হিসাবেও পতন হয়েছে। বর্তমানে একক নামে বিও হিসাব রয়েছে ১২ লাখ ২৫৭টি, যা জুন শেষে ছিল ১২ লাখ ১৫ হাজার ২৮৫টি। অর্থাৎ একক হিসাব কমেছে ১৫ হাজার ২৮টি। যৌথ নামে বিও হিসাব বর্তমানে ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৮৯২টি, যা জুন শেষে ছিল ৪ লাখ ৪১ হাজার ৬২২টি। এ ক্ষেত্রে কমেছে ৭ হাজার ৭৩০টি হিসাব।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সূচক বৃদ্ধি এখনো বিনিয়োগকারীদের স্থায়ী আস্থায় রূপ নিতে পারেনি। দীর্ঘদিনের দরপতন, তারল্য সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির অভিজ্ঞতা বাজারে নতুন বিনিয়োগ প্রবাহকে দুর্বল করে রেখেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিক সরে যাওয়া বাজারের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার ঘাটতিরও ইঙ্গিত দেয়।
তাদের মতে, শেয়ারবাজারে টেকসই পুনরুদ্ধার দেখতে হলে শুধু সূচক বাড়লেই হবে না; প্রয়োজন লেনদেনের গতি বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন। বর্তমান পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, বাজারে কিছু ইতিবাচক সংকেত থাকলেও বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

