দেশের পুঁজিবাজারে টানা চতুর্থ মাসের মতো ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সংস্কার উদ্যোগ এবং তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা বৃদ্ধির প্রভাবে গত জুলাই মাসজুড়ে বাজারে ছিল উর্ধ্বমুখী প্রবণতা। মাস শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্যসূচক প্রায় ১৩৩ পয়েন্ট বা সোয়া দুই শতাংশের বেশি বেড়ে পৌঁছে যায় প্রায় ৫ হাজার ৮৯৬ পয়েন্টে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বৃদ্ধির প্রতিফলন হিসেবে দৈনিক গড় লেনদেনও প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৫৫ কোটি টাকায়।
বাজার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, জুলাইয়ের শুরু থেকেই শেয়ার কেনার আগ্রহ বেড়েছিল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। এর ধারাবাহিকতায় মাসের মাঝামাঝি সময়ে সূচক গত দুই বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, প্রায় ৫ হাজার ৯২৬ পয়েন্টে। ওই সময় লেনদেনের পরিমাণও দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে, প্রায় ১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকায়। তবে মার্জিন ঋণ সংক্রান্ত নীতিমালার চূড়ান্ত রূপ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে কিছু বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে নিতে শেয়ার বিক্রি শুরু করেন, যার ফলে বাজারে সাময়িক সংশোধন দেখা দেয়।
তবে মাসের শেষদিকে এসে পরিস্থিতি আবার ঘুরে যায়। আন্তর্জাতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়া এবং ডিসেম্বর-ভিত্তিক হিসাব বছর শেষ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলাফল প্রকাশ পাওয়ায় নতুন করে ক্রয়চাপ তৈরি হয়। এর ফলেই টানা চার মাস ধরে বাজারে ইতিবাচক ধারা বজায় থাকে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মুনাফা এসেছে মিউচুয়াল ফান্ড খাত থেকে, যেখানে রিটার্নের হার প্রায় ২২ শতাংশ। এরপরই রয়েছে বস্ত্র খাত, প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ রিটার্ন নিয়ে। এছাড়া খাদ্য ও সহায়ক পণ্য খাতে সাড়ে সাত শতাংশের কাছাকাছি, পাটজাত পণ্যে সাড়ে ছয় শতাংশ, পর্যটন ও অবকাশ খাতে ছয় শতাংশের বেশি, চামড়াজাত পণ্যে প্রায় ছয় শতাংশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে সাড়ে পাঁচ শতাংশের বেশি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ব্যতিক্রম শুধু টেলিযোগাযোগ খাত, যেখানে সামান্য নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। লেনদেনের পরিমাণের বিচারে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল বস্ত্র খাত, মোট লেনদেনের প্রায় সাড়ে সতেরো শতাংশ যার দখলে। এরপর যথাক্রমে বীমা ও ওষুধ-রসায়ন খাত ছিল লেনদেনের শীর্ষ তালিকায়।
সূচকের এই উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে তামাক খাতের একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, যার শেয়ারদর প্রায় পনেরো শতাংশ বেড়ে সূচকে যোগ করেছে সাড়ে আঠারো পয়েন্টের বেশি। এর পাশাপাশি একটি ওষুধ কোম্পানি ও একটি ব্যাংকের শেয়ারদর বৃদ্ধিও সূচকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আরও কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের শেয়ারও সূচক ঊর্ধ্বমুখী রাখতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে সূচকের গতি কমাতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে একটি বহুজাতিক শিল্প গোষ্ঠীর প্রধান কোম্পানি, যার শেয়ারদর প্রায় একুশ শতাংশ কমে যাওয়ায় সূচক থেকে প্রায় পনেরো পয়েন্ট হারিয়ে গেছে। এছাড়া একটি বেসরকারি ব্যাংক ও একটি শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানির শেয়ারদর কমার কারণেও সূচকে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় ছিল স্পিনিং, তথ্যপ্রযুক্তি পরামর্শক এবং বন্দর-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার।
বাজার সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিক উত্থানের পেছনে দেশের মুদ্রানীতি ও সুদহারের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ের বিনিয়োগ চাঙা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি নীতি সুদহার অর্ধ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়েছে। এর প্রভাবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারও নিম্নমুখী হয়েছে, যা একদিকে ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়িয়েছে, অন্যদিকে পুঁজিবাজারমুখী বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। এছাড়া ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির শক্তিশালী আর্থিক ফলাফলও সার্বিক বাজার পরিস্থিতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আঞ্চলিক পুঁজিবাজারের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একই সময়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বাজার সূচক বেড়েছে সোয়া দুই শতাংশের বেশি, থাইল্যান্ডে বেড়েছে প্রায় দুই শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ। বিপরীতে পাকিস্তানের প্রধান সূচক কমেছে সোয়া দুই শতাংশের বেশি, শ্রীলংকার সূচক কমেছে পাঁচ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের সূচক হারিয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় শতাংশ পয়েন্ট।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নীতি সুদহার হ্রাস, ভালো কোম্পানির আর্থিক ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা প্রশমনের মতো একাধিক ইতিবাচক নিয়ামকের সম্মিলিত প্রভাবেই দেশের পুঁজিবাজার টানা চার মাস ধরে ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পেরেছে। তবে বিশ্লেষকদের অনেকে সতর্ক করে বলছেন, স্বল্প সময়ে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ভবিষ্যতে বাজারে সংশোধনের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে, তাই বিনিয়োগকারীদের সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।

