দেশের পুঁজিবাজারে শেয়ারদরে অস্বাভাবিক উত্থান, সন্দেহজনক লেনদেন, অর্থ পাচারের অভিযোগ এবং বিনিয়োগকারীদের নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে একের পর এক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। তালিকাভুক্ত কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড, ব্রোকারেজ হাউস এবং মার্চেন্ট ব্যাংকসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বর্তমানে একযোগে তদন্ত ও অনুসন্ধান চালাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো, কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ না করেই মাত্র এক মাসের মধ্যে একটি ব্যাংকের মালিকানাধীন মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দাম প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়া। জুলাই মাসের শুরুতে যে ইউনিটের দাম ছিল প্রায় সাড়ে তিন টাকা, আগস্টের শুরুতে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাত টাকায়। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ খুঁজে বের করতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছে কমিশন। তদন্তে সম্ভাব্য কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং, মার্জিন বিধিমালা প্রতিপালন এবং সংশ্লিষ্ট ব্রোকারদের সম্ভাব্য ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের এক গ্রাহকের বিনিয়োগ হিসাবে সংঘটিত সন্দেহজনক লেনদেন এবং সম্ভাব্য অর্থ পাচারের অভিযোগও অনুসন্ধান করছে কমিশন। এই তদন্তের জন্য গঠন করা হয়েছে তিন সদস্যের একটি কমিটি, যাদের ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এই অনুসন্ধানে লেনদেনের প্রকৃতি, অর্থের প্রকৃত উৎস এবং আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে।
শুধু সন্দেহজনক লেনদেনই নয়, বিনিয়োগকারীদের সরাসরি অভিযোগের ভিত্তিতেও একাধিক তদন্ত শুরু হয়েছে। এক বিনিয়োগকারীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া শেয়ার বিক্রি, মার্জিন বিধিমালা লঙ্ঘন এবং বেআইনিভাবে জোরপূর্বক শেয়ার বিক্রির অভিযোগে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। অভিযোগ অনুযায়ী, গ্রাহকের সম্মতি ছাড়াই প্রায় নয় কোটি টাকা মূল্যমানের একটি ওষুধ কোম্পানির প্রায় সাত লাখ শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া হয়, যেখানে প্রয়োজনীয় মার্জিন কল দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
আরেকটি লক্ষণীয় ঘটনা হলো, এসএমই প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত একটি ওষুধ কোম্পানির শেয়ারদর কোনো প্রকাশযোগ্য তথ্য ছাড়াই পাঁচ মাসে প্রায় ১৮৬ শতাংশ বেড়ে যাওয়া। যদিও স্টক এক্সচেঞ্জের অনুসন্ধানের জবাবে কোম্পানিটি জানিয়েছে, এমন মূল্যবৃদ্ধি ঘটানোর মতো কোনো অপ্রকাশিত তথ্য তাদের কাছে নেই। তবু সম্ভাব্য কারসাজি ও ইনসাইডার ট্রেডিং খতিয়ে দেখতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।
আরও চাঞ্চল্যকর একটি ঘটনা ঘটেছে রাষ্ট্রায়ত্ত একটি কাচ কারখানার শেয়ারে। প্রায় তিন বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ, ধারাবাহিক লোকসান এবং দীর্ঘদিন কোনো লভ্যাংশ না দেওয়া সত্ত্বেও মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে এই কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে ১৬০ শতাংশের বেশি। এই অস্বাভাবিক ঘটনায় ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে স্টক এক্সচেঞ্জ, একই সঙ্গে বিষয়টিকে বিশেষ নজরদারিতে রেখেছে কমিশনও। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, বন্ধ বা লোকসানি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে এ ধরনের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সংঘবদ্ধ কারসাজি চক্রের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বীমা খাতের দুটি কোম্পানির শেয়ারদরেও অস্বাভাবিক উত্থান নজরে এসেছে কমিশনের। এর একটির শেয়ারদর মাত্র ১২ কার্যদিবসে বেড়েছে প্রায় সাড়ে একুশ শতাংশ, অন্যটির দাম বেড়েছে অল্প কয়েক দিনেই প্রায় ষোলো শতাংশ। কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই এমন মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে দুই কোম্পানির বিষয়ে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে স্টক এক্সচেঞ্জকে।
এসবের পাশাপাশি আরেকটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরু করেছে কমিশন, যেখানে অভিযোগ রয়েছে গ্রাহকের অনুমোদন ছাড়া শেয়ার লেনদেন, নিয়মবহির্ভূতভাবে সাধারণ হিসাবকে মার্জিন হিসাব হিসেবে ব্যবহার, অননুমোদিত ঋণসুবিধা প্রদান, অতিরিক্ত লেনদেনের মাধ্যমে কমিশন আয় এবং বৈধ চুক্তি ছাড়াই সুদ আদায়ের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ। এই তদন্তেও গঠন করা হয়েছে তিন সদস্যের পৃথক একটি কমিটি, যারা বিনিয়োগকারীদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ করবে।
এ বিষয়ে কমিশনের একজন মুখপাত্র গণমাধ্যমকে জানান, শেয়ারদর বা লেনদেনে যেকোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা এবং বিনিয়োগকারীদের অভিযোগকে কমিশন সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তদন্তে কোনো অনিয়ম বা আইন লঙ্ঘনের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
তবে বাজার সংশ্লিষ্টদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এসব তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।

