দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গত সপ্তাহজুড়ে দাম বাড়ার তালিকায় স্পষ্ট আধিপত্য দেখিয়েছে দীর্ঘদিন লভ্যাংশবঞ্চিত জেড গ্রুপের কোম্পানিগুলো। দাম বৃদ্ধির শীর্ষ দশ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাতটিই এই গ্রুপের দখলে চলে গেছে।
উল্লেখ্য, লভ্যাংশ প্রদানের ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ, বি ও জেড—এই তিন গ্রুপে ভাগ করা হয়। দশ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠান থাকে এ গ্রুপে, দশ শতাংশের কম দিলে তা বি গ্রুপে, আর যেসব প্রতিষ্ঠান লভ্যাংশই দেয় না, সেগুলো পড়ে জেড গ্রুপে—যা বাজারে সাধারণত দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানি হিসেবে পরিচিত।
গত সপ্তাহে দাম বৃদ্ধির তালিকায় সবচেয়ে বড় লাফ দিয়েছে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যার শেয়ার দর সপ্তাহজুড়ে বেড়েছে প্রায় সাড়ে একত্রিশ শতাংশ। বিনিয়োগকারীদের একাংশের হঠাৎ আগ্রহের কারণে টাকার অঙ্কে প্রতি শেয়ারে ষাট পয়সা বৃদ্ধি পেয়ে সপ্তাহ শেষে দর দাঁড়িয়েছে দুই টাকা পঞ্চাশ পয়সায়, যা আগের সপ্তাহে ছিল এক টাকা নব্বই পয়সা। এতে কোম্পানিটির মোট বাজারমূল্য এক সপ্তাহে বেড়েছে প্রায় সাড়ে নয় কোটি টাকা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রতিষ্ঠান সর্বশেষ ২০১৬ সালে বিনিয়োগকারীদের পাঁচ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল, এরপর থেকে আর কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি বলেই এটি জেড গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারপ্রতি প্রায় পৌনে চার টাকা লোকসান করেছে। ২০১৩ সালে তালিকাভুক্ত হওয়া এই কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন প্রায় একশ চৌষট্টি কোটি টাকা, শেয়ার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ষোলো কোটি। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে আছে প্রায় চল্লিশ শতাংশ শেয়ার, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে সাড়ে পঁয়তাল্লিশ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রায় পনেরো শতাংশ।
এই প্রতিষ্ঠানের পরই দাম বৃদ্ধির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল একটি বস্ত্র খাতের কোম্পানি, যার শেয়ার দর বেড়েছে প্রায় সাড়ে আটাশ শতাংশ। ২০১৬ সালের পর এই কোম্পানিও কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। তৃতীয় স্থানে থাকা একটি বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানির দর বেড়েছে প্রায় সাড়ে সাতাশ শতাংশ, যা ২০২৩ সালের পর থেকে কোনো লভ্যাংশই দেয়নি।
এদিকে দাম কমার তালিকায় শীর্ষ দশে থাকা বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদরও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে—কোনোটির পঁচিশ শতাংশ পর্যন্ত, কোনোটির বিশ শতাংশের বেশি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোও দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিচ্ছে না।
দাম বৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় থাকা বাকি তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি বীমা কোম্পানির দর বেড়েছে প্রায় সাড়ে ঊনিশ শতাংশ, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দর বেড়েছে প্রায় সাড়ে ষোলো শতাংশ এবং একটি মিউচুয়াল ফান্ডের দর বেড়েছে প্রায় সাড়ে পনেরো শতাংশ। এর মধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি জেড গ্রুপের হলেও বাকি দুটি এ গ্রুপভুক্ত।
সব মিলিয়ে সাপ্তাহিক লেনদেনের এই চিত্র থেকে স্পষ্ট, বাজারে মৌলভিত্তির চেয়ে জল্পনা-নির্ভর কেনাবেচার প্রবণতাই বেশি সক্রিয় ছিল—যেখানে দুর্বল আর্থিক ভিত্তি ও দীর্ঘদিনের লভ্যাংশ-বঞ্চনা থাকা সত্ত্বেও কিছু কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের হঠাৎ আগ্রহ দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বাজার-সংশ্লিষ্টরা।

