শেয়ারবাজারের সূচক বাড়ছে—খবরটি শুনে মনে হতে পারে বাজারের প্রায় সব বিনিয়োগকারীই লাভ করছেন। বাস্তবে চিত্রটি অনেক সময় ভিন্ন। সূচক বাড়লেও নিজের হাতে থাকা শেয়ারের দাম কমতে পারে, এমনকি বাজারের বেশির ভাগ শেয়ারের দাম কমার মধ্যেও সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে।
এর মূল কারণ হলো, বাজারের সূচক সব শেয়ারের দামকে সমান গুরুত্ব দিয়ে হিসাব করা হয় না। ঢাকার শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স মূলত কোম্পানির বাজার মূলধন ও সাধারণের হাতে লেনদেনযোগ্য শেয়ারের পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে তৈরি হয়। ফলে বড় কোম্পানির শেয়ারের দামে সামান্য পরিবর্তন হলেও সূচকে তার প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়ে। অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি কোম্পানির অনেক শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও সূচকের ওপর তার প্রভাব তুলনামূলক কম হতে পারে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও বলছে, বাজার মূলধনভিত্তিক সূচকে প্রতিটি কোম্পানির ওজন তার বাজার মূলধনের ওপর নির্ভর করে।
সাম্প্রতিক বাজারের কিছু তথ্য বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে ডিএসইএক্স কয়েক দফা বেড়ে প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ১৪ জুলাই সূচক ৫ হাজার ৯১১ পয়েন্টে ওঠে এবং টানা চার কার্যদিবসে সূচক মোট ১৪১ পয়েন্ট বাড়ে। কিন্তু একই সময় বাজারে সব শেয়ারের দাম সমানভাবে বাড়েনি। এমনকি পরবর্তী সময়ে ১৬ জুলাই ২২৪টি শেয়ারের দাম কমলেও মাত্র ১১০টি শেয়ারের দাম বেড়েছিল। অর্থাৎ সূচকের অবস্থান এবং বাজারের অধিকাংশ শেয়ারের বাস্তব অবস্থা একই ছবি দেখায়নি।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—সূচক বাড়ার পেছনে কয়েকটি বড় কোম্পানির শেয়ারের ভূমিকা অনেক বেশি হতে পারে। ধরুন, একটি বাজারে বড় কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে ছোট ও মাঝারি আকারের অনেক কোম্পানির শেয়ারের দাম কমছে। বড় কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধন বেশি হওয়ায় তাদের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সূচকে বেশি পড়বে। ফলে সংবাদে বাজারের সূচককে সবুজ দেখা গেলেও একজন বিনিয়োগকারী যদি মূলত ছোট ও মাঝারি কোম্পানির শেয়ার ধরে রাখেন, তাঁর বিনিয়োগের মূল্য কমে যেতে পারে। এ কারণেই শুধু সূচক দেখে বাজারের প্রকৃত অবস্থা বোঝা সবসময় সম্ভব নয়।
বাজারের সার্বিক চিত্র বুঝতে তাই সূচকের পাশাপাশি কতটি শেয়ারের দাম বেড়েছে, কতটি কমেছে, লেনদেনের পরিমাণ কত এবং কোন খাত থেকে সূচকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন এসেছে—এসব বিষয়ও দেখা প্রয়োজন। জুলাইয়ের শেষ দিকের একটি উদাহরণে দেখা যায়, ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৩০৯ পয়েন্টে উঠে ৮ দশমিক ৩ পয়েন্ট বাড়লেও ওই দিন ৩৯৭টি লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৮৮টির দাম বেড়েছিল, বিপরীতে ২৪৭টির দাম কমেছিল। অর্থাৎ সূচক বাড়লেও অধিকাংশ শেয়ারের বিনিয়োগকারী সেই দিনের বাজার থেকে লাভ পাননি।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য আরেকটি বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সূচক বাড়তে থাকলে অনেকেই মনে করেন এখনই বাজারে ঢোকার ভালো সময়। কিন্তু সূচকের উত্থান যদি কয়েকটি বড় কোম্পানিনির্ভর হয়, তাহলে সেই উত্থান সবার বিনিয়োগে সমানভাবে প্রতিফলিত হবে না। আবার কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লেই যে কোম্পানিটির ব্যবসা, মুনাফা বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও একই হারে ভালো হয়েছে, সেটিও ধরে নেওয়া যায় না। বাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, তারল্য, সুদের হার, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত এবং নির্দিষ্ট কোম্পানি সম্পর্কে খবর—সবকিছুই শেয়ারের দামে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই শেয়ারবাজারের সূচককে পুরো বাজারের তাপমাত্রা মাপার একটি যন্ত্র বলা যায়, কিন্তু এটি প্রত্যেক বিনিয়োগকারীর লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়। সূচক বাড়ছে কি না, তার পাশাপাশি নিজের হাতে থাকা শেয়ারের দাম, কোম্পানির আর্থিক অবস্থান এবং বাজারে কতগুলো শেয়ারের দাম আসলে বাড়ছে—এসব দেখাই বিনিয়োগকারীর জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাজার সবুজ হলেই যে সবার পোর্টফোলিও সবুজ হবে, এমন নয়।

