পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত একটি অগ্রণী ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক বিপরীতমুখী চিত্র। হিসাবের খাতায় প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু এর মূল কাজ অর্থাৎ ঋণ বিতরণ ব্যবসায় দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ধস। সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ থেকে পাওয়া অস্বাভাবিক আয়ের কারণেই মূলত বড় ক্ষতির মুখ থেকে রক্ষা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সাধারণত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আমানত সংগ্রহ করে তা ঋণ হিসেবে বিতরণ করে সুদ আয়ের মাধ্যমে মুনাফা করে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। আগের বছর যেখানে নিট সুদ আয় ছিল ২৩৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২০২৫ সালে তা প্রায় ১৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২০০ কোটি ৬০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ মূল ব্যবসা থেকে প্রায় ৩৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা আয় কমে গেছে এক বছরেই। উল্টো দিকে আমানতকারীদের সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে ঋণ থেকে আয় বাড়াতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
এই ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছে বিনিয়োগ খাত। ট্রেজারি বন্ড ও অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে আয় আগের বছরের ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা থেকে প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩২ কোটি ৪০ লাখ টাকায়—প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৯৩ শতাংশ। মূলত এই আয়ের জোরেই নিট মুনাফা ৩৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বাজার বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, মূল ব্যবসার দুর্বলতা ঢেকে রাখতে এই বিনিয়োগ আয় অনেকটা কৃত্রিম ঢাল হিসেবে কাজ করেছে।
খেলাপি ঋণের চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ৪০৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৪৪৫ কোটি ৩০ লাখ টাকায়। খেলাপি ঋণের গড় হার বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বাজে অবস্থা ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে, যেখানে খেলাপির হার ছাড়িয়েছে ১৫ শতাংশ। কৃষিঋণেও খেলাপির হার প্রায় ১২ শতাংশ। উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ঋণ অবলোপনের পরও এই চিত্র প্রতিষ্ঠানের ঋণ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১০৫ কোটি ৭০ লাখ টাকার ঋণ অবলোপন করেছে, আগের বছরের তুলনায় যা সোয়া শ শতাংশেরও বেশি। মূলধন পর্যাপ্ততার হারও কিছুটা কমে ১৮ শতাংশের ঘর থেকে নেমে এসেছে সতেরো শতাংশের কাছাকাছি—যদিও তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সর্বনিম্ন সীমার চেয়ে এখনো বেশি। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রতিবেদনে ঋণ শ্রেণীকরণ ও নিরাপত্তা সঞ্চিতি নির্ধারণকে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণযোগ্য বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে জানিয়েছে, ঋণ শ্রেণীকরণে ব্যবস্থাপনার নিজস্ব বিচার-বিবেচনার প্রয়োগ প্রকৃত ঝুঁকির সম্পূর্ণ প্রতিফলন নাও হতে পারে।
তারল্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণেও উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। পাঁচ বছরের বেশি মেয়াদি সম্পদ ও দায়ের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪১৪ কোটি টাকার ব্যবধান রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশে তথ্যগত অসংগতিও চোখে পড়েছে—যেমন প্রশিক্ষণ ব্যয়ের হিসাব দুই জায়গায় দুই রকম দেখানো হয়েছে, শাখার সংখ্যাতেও গরমিল আছে। এ ছাড়া মোট ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশই কেন্দ্রীভূত শুধু একটি বিভাগে, যা ভৌগোলিক ঝুঁকির প্রশ্ন তোলে। গত বছর প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৩ শতাংশ দক্ষ জনবল চাকরি ছেড়ে যাওয়ার তথ্যও অভ্যন্তরীণ কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করছে। স্বল্পমেয়াদে মুনাফা বাড়লেও পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির চিত্র আসলে ঋণাত্মক, প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ।
এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সুদ আয় কমা আর বন্ড থেকে আয় বাড়াকে মূল ব্যবসায় ক্ষতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি সচেতন বিনিয়োগ কৌশলের ফল। প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিচালন আয় আগের তুলনায় সাড়ে ৭ শতাংশ বেড়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। উচ্চ সুদের বাজারে ঝুঁকি কমাতে তহবিলের একাংশ নিরাপদ সরকারি বন্ডে সরানোর কারণেই বিনিয়োগ আয় বেড়েছে, ফলে সামগ্রিক আয় কমেনি বরং উৎস পরিবর্তন হয়েছে মাত্র।
ঋণ অবলোপন প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা, এটি ঋণ মওকুফ নয় বরং হিসাবরক্ষণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যাতে ব্যালেন্স শিট আরও স্বচ্ছ থাকে। অবলোপিত ঋণের বিপরীতে শতভাগ সঞ্চিতি রাখা হয়েছে এবং আদায় প্রক্রিয়া চলমান আছে বলেও জানানো হয়। খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য, শুধু একটি খাতের তথ্য দিয়ে সামগ্রিক ঝুঁকি বিচার করা ঠিক নয়; ডলার সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপে শিল্প খাতে খেলাপি ঋণ বাড়লেও সামগ্রিক হার এখনো খাতের গড়ের তুলনায় কম। তারল্য ঘাটতিকে নগদ সংকট নয় বরং মেয়াদগত সময়ের ব্যবধান হিসেবে ব্যাখ্যা করে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বন্ড ইস্যু ও খুচরা আমানত বাড়িয়ে এই ব্যবধান মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বর্তমান তারল্য অনুপাত নিয়ন্ত্রক সীমার চেয়ে বেশি রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, উচ্চ প্রভিশনিং ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘমেয়াদি মুনাফা প্রবৃদ্ধি কমলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো লাভজনক এবং টানা অষ্টমবারের মতো সর্বোচ্চ ক্রেডিট রেটিং ধরে রেখেছে।
২০০৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ‘এ’ ক্যাটাগরির কোম্পানি হিসেবে বিবেচিত এবং সর্বশেষ বছরে শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৩ কোটি শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের কাছে রয়েছে ৪০ শতাংশ, সরকারের কাছে প্রায় ২২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রায় ২৪ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বাকি অংশ।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কোনো দৃশ্যমান মৌলিক কারণ ছাড়াই সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর অস্বাভাবিক বাড়তে থাকায় বিষয়টিকে সন্দেহজনক মনে করছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক কমিশন। এ কারণে শেয়ারদর বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে স্টক এক্সচেঞ্জকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং কমিশনের নজরদারি বিভাগ শেয়ার লেনদেন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সর্বশেষ কার্যদিবসে শেয়ারটির দর ছিল ৩১ টাকা ৪০ পয়সা।

