পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করার পর এবার সেগুলোর শেয়ার কেনাবেচা বন্ধ করে দিয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও ফারইস্ট ফাইন্যান্স। তবে এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতার একটি চিত্রও উঠে এসেছে—প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক রোববার রাতেই এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেও, শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা স্টক এক্সচেঞ্জকে বিষয়টি জানানো হয়নি তাৎক্ষণিকভাবে।
এই যোগাযোগ-বিচ্যুতির কারণেই লেনদেন স্থগিত হওয়ার আগে সোমবার বাজারে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে স্বাভাবিক লেনদেন শুরু হয়ে যায়, যেখানে দাম পড়ে যায় সাড়ে সাত থেকে প্রায় নয় শতাংশ পর্যন্ত। যদিও অভিহিত মূল্য ১০ টাকা হলেও এসব শেয়ারের বাজারমূল্য এমনিতেই অনেক দিন ধরে নিম্নমুখী ছিল—সোমবার শেষবারের মতো লেনদেন হয় মাত্র দুই টাকার সামান্য বেশি দরে।
অকার্যকর ঘোষণার পরও কীভাবে এসব শেয়ার বাজারে কেনাবেচা হলো, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটিই বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আগেভাগে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। সোমবার সকালে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই শেয়ার লেনদেন স্থগিতের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে কিছুটা সময় লেগে যায়।
জানা গেছে, অকার্যকর ঘোষিত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সব সম্পদ বিক্রি করে সেগুলো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ বা অবসায়নের প্রক্রিয়ায় নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথকভাবে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যাঁরা এখন সম্পদ মূল্যায়ন ও দায়দেনা পরিশোধের কার্যক্রম শুরু করবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া তো দূরের কথা, বহু আগেই স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিল। এ কারণেই সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে দায় মেটানোর পর এগুলো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য, এর আগে ব্যাংক রেজল্যুশন-সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশের আওতায় বেশ কয়েকটি সংকটাপন্ন ব্যাংককে একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যেখানে উদ্যোক্তা, পরিচালক ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের সব শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা হলেও ব্যাংক খাতে আস্থা রক্ষায় আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা দিয়েছিল সরকার।
শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার একজন নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র জানিয়েছেন, অকার্যকর ঘোষিত প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার লেনদেন আপাতত বন্ধ রাখা হলেও এসব শেয়ারের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনো তথ্য তাঁদের কাছে নেই, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার ছিল প্রায় শতভাগ, অর্থাৎ ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। প্রায় একই রকম ভয়াবহ চিত্র বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানেও—ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে এই হার ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। তালিকাভুক্ত নয় এমন আরেকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৯৪ শতাংশের কাছাকাছি বলে জানা গেছে।
অকার্যকর ঘোষিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাধারণ বিনিয়োগকারীর মালিকানা রয়েছে এফএএস ফাইন্যান্সে—প্রায় ৭৯ শতাংশ। বিপরীতে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশের মতো শেয়ার, বাকিটা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে। অর্থাৎ এই প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ন মানে দাঁড়াচ্ছে, প্রায় চার-পঞ্চমাংশ মালিকানার অধিকারী সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সমুদয় পুঁজি একেবারে শূন্যে নেমে আসা।
ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়েও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশ প্রায় সাড়ে ৪৪ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে আরও প্রায় ১৪ শতাংশ, বাকিটা উদ্যোক্তা-পরিচালকদের দখলে। একই রকম চিত্র ফারইস্ট ফাইন্যান্সেও—সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা সাড়ে ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রায় ১৫ শতাংশ এবং উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে প্রায় ৪০ শতাংশ শেয়ার।
উল্লেখ্য, রুগ্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবসায়ন বা একীভূত করার প্রক্রিয়ায় আমানতকারীদের পাশাপাশি পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থাও যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সে বিষয়ে গত ফেব্রুয়ারিতেই বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি চিঠি দিয়েছিল শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ওই চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, তালিকাভুক্ত অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতির জন্য সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোনোভাবেই দায়ী নন, তাই এসব প্রতিষ্ঠান অবসায়নের সময় তাঁদের ন্যূনতম স্বার্থরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে বাস্তবে সেই সতর্কতা কতটা প্রতিফলিত হবে, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

