ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের শীর্ষস্থানীয় কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শেয়ার লেনদেনে অনিয়ম, আর্থিক গরমিল ও সুশাসন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিতে সম্প্রতি অস্বাভাবিকভাবে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। এই দুটি বিষয় খতিয়ে দেখতে আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
গত ১০ আগস্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিদর্শন ও তদন্ত বিভাগের একজন অতিরিক্ত পরিচালকের স্বাক্ষরে পৃথক দুটি আদেশ জারি করে এই কমিটি দুটি গঠন করা হয়। উভয় কমিটিকেই আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালায় দেওয়া বিশেষ ক্ষমতাবলে এই তদন্ত শুরু হয়েছে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাষ্যে, পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রথম কমিটিতে রয়েছেন তিনজন কর্মকর্তা, যাদের একজনকে প্রধান করা হয়েছে। এই কমিটি দেখবে—এক্সচেঞ্জের এক শেয়ারহোল্ডার সদস্যের করা আর্থিক অনিয়ম, সুশাসনের ঘাটতি ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ কতটা সত্য। পাশাপাশি এক্সচেঞ্জের শীর্ষ নির্বাহীদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের পুঁজিবাজারে সরাসরি বা ঘুরিয়ে শেয়ার লেনদেনে জড়িত থাকার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আসবে—যা মূলত ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত।
এ ছাড়া চুক্তিভিত্তিক পদ, উপদেষ্টা নিয়োগ কিংবা শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বোর্ড কমিটিগুলো এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভূমিকা কতটা যথাযথ ছিল, তাও যাচাই করবে কমিটি। সংশ্লিষ্ট আইনের গোপনীয়তা রক্ষা সংক্রান্ত ধারা লঙ্ঘন করে কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য ফাঁস করেছে কিনা, সেই অভিযোগের সত্যতাও যাচাই করা হবে।
দ্বিতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে সাম্প্রতিক কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা তদন্তের জন্য। এই কমিটিতেও তিনজন কর্মকর্তা রয়েছেন। তারা খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন, ছাঁটাইয়ের প্রকৃত কারণ কী ছিল এবং এই প্রক্রিয়ায় বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কমিটির ভূমিকা কেমন ছিল। পাশাপাশি ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সার্ভিস রুলস ও দেশের প্রচলিত শ্রম আইন যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কিনা, তাও পরীক্ষা করে দেখা হবে।
তদন্তে আরও দেখা হবে, এই ছাঁটাইয়ের নেপথ্যে মানবসম্পদ বিভাগের কোনো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কাজ করেছে কিনা এবং তা ন্যায্য প্রশাসন সংক্রান্ত আইনি বিধান লঙ্ঘন করেছে কিনা। একই সঙ্গে প্রচলিত নিয়ম উপেক্ষা করে ছাঁটাই প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা অন্য কোনো পরিচালকের বাড়তি প্রভাব ছিল কিনা, সেটিও খুঁজে বের করবে কমিটি।
তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মুখপাত্র জানান, প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
জানা গেছে, সম্প্রতি দুই দফায় মোট ২৮ জন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করেছে এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ। এদের মধ্যে রয়েছেন সংস্থাটির সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা ও একজন উপমহাব্যবস্থাপক। তিনি এই ছাঁটাইকে অন্যায্য ও বেআইনি দাবি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রতিকার চেয়ে আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার নিষ্পত্তি এখন নির্ভর করছে এই দুই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা পড়লে তা পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

