বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মূলধন ও লভ্যাংশ নীতির মধ্যে অনুমোদিত মূলধন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সিটি ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত মূলধন ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ২ হাজার কোটি টাকা থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন শেয়ার ইস্যু করে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে চায় ব্যাংকটি।
সিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সাম্প্রতিক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে দেওয়া মূল্যসংবেদনশীল তথ্যে জানানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৩ হাজার কোটি টাকা হলে মোট ৩০০ কোটি সাধারণ শেয়ারে ভাগ হবে, প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য থাকবে ১০ টাকা। তবে শুধু পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তেই এই পরিবর্তন কার্যকর হচ্ছে না। এর জন্য শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন এবং পরবর্তী সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাড়পত্র প্রয়োজন হবে। এ বিষয়ে শেয়ারহোল্ডারদের মতামত নিতে আগামী ৪ অক্টোবর বেলা ৩টায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিশেষ সাধারণ সভা বা ইজিএম আয়োজনের কথা জানিয়েছে ব্যাংক। সভায় অংশ নেওয়ার যোগ্য শেয়ারহোল্ডার নির্ধারণে রেকর্ড তারিখ রাখা হয়েছে ৬ সেপ্টেম্বর।
সিটি ব্যাংকের এই উদ্যোগের পেছনে বড় একটি কারণ হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন লভ্যাংশ নীতি। গত ২৩ মে জারি করা এক নির্দেশনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে যেসব ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার নিচে থাকবে, তারা নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে না। এমনকি ২ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি পরিশোধিত মূলধন থাকা ব্যাংকের ক্ষেত্রেও নগদে পুরো লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি; ঘোষিত লভ্যাংশের সর্বোচ্চ অর্ধেক নগদে দেওয়া যাবে, বাকি অংশ শেয়ার বা বোনাস শেয়ারের মাধ্যমে দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকগুলোর হাতে আরও বেশি মূলধন ধরে রাখা, যাতে ভবিষ্যতের ঝুঁকি সামলানোর সক্ষমতা বাড়ে এবং আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত থাকে।
সিটি ব্যাংকের বর্তমান পরিশোধিত মূলধন প্রায় ১ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন নিয়মের নগদ লভ্যাংশের শর্ত পূরণ করতে ব্যাংকটির আরও প্রায় ২৫১ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন বাড়াতে হবে। অনুমোদিত মূলধন বাড়ানোর প্রস্তাবটি সরাসরি ওই অর্থ সংগ্রহ করছে না; বরং ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন শেয়ার ইস্যু করে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর জন্য আইনি ও করপোরেট জায়গা তৈরি করছে। ব্যাংকের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনুমোদিত মূলধন হলো একটি কোম্পানি সর্বোচ্চ কত মূল্যের শেয়ার ইস্যু করতে পারবে তার সীমা। সেই সীমা না বাড়ালে পরবর্তীতে নতুন শেয়ার ইস্যু করে মূলধন বাড়ানোর সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। ফলে সিটি ব্যাংকের বর্তমান পদক্ষেপকে তাৎক্ষণিক মূলধন সংগ্রহের চেয়ে ভবিষ্যতের মূলধন পরিকল্পনার প্রস্তুতি হিসেবেই দেখা যায়।
এর আগে ২০২৫ সালের জন্য সিটি ব্যাংক তার শেয়ারহোল্ডারদের ১৫ শতাংশ নগদ ও ১৫ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ দেওয়ার অনুমোদন পেয়েছে। ব্যাংকটির আর্থিক ফলও সাম্প্রতিক সময়ে শক্তিশালী ছিল। ২০২৫ সালে সিটি ব্যাংকের সমন্বিত কর-পরবর্তী মুনাফা বেড়ে রেকর্ড ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়, যা আগের বছরের ১ হাজার ১৪ কোটি টাকার তুলনায় ৩১ শতাংশ বেশি। ব্যাংকটির ঋণ থেকে সুদ আয়ও বেড়েছে এবং একই সময়ে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমে ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেও ব্যাংকটির মুনাফায় ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, বছরের প্রথমার্ধে সিটি ব্যাংকের সমন্বিত মুনাফা প্রায় ৫২৬ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকটি একদিকে মুনাফা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন মূলধন কাঠামোর সঙ্গেও নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই দুই বিষয় একসঙ্গে দেখলে অনুমোদিত মূলধন বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি শুধু লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নয়, ভবিষ্যতে ব্যবসা বাড়াতে প্রয়োজনীয় মূলধনের জায়গা তৈরি করার কৌশল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে অনুমোদিত মূলধন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদেও পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে সিটি ব্যাংক। ব্যাংকটির সর্বোচ্চ অনির্বাচিত বা নন-ইনডিপেনডেন্ট পরিচালক সংখ্যা আটজন থেকে বাড়িয়ে ১০ জন করার জন্য কোম্পানির মেমোরেন্ডাম ও আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনের সংশ্লিষ্ট ধারা পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকের পর্ষদে বিভিন্ন শেয়ারহোল্ডার ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এই সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগের ফলে ভবিষ্যতে নতুন বিনিয়োগকারী বা কৌশলগত অংশীদারদের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে সিটি ব্যাংকের সাম্প্রতিক উদ্যোগকে শুধু একটি করপোরেট পরিবর্তন হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় দিকটি বাদ পড়ে যায়। ব্যাংক খাতে যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা মূলধন শক্তিশালী করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন বেসরকারি ব্যাংকগুলোকেও নিজেদের মূলধন কাঠামো নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। সিটি ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন বাড়ানোর প্রস্তাব সেই পরিবর্তনেরই একটি উদাহরণ। তবে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের পরও ব্যাংককে পরিশোধিত মূলধন বাড়াতে আলাদা পদক্ষেপ নিতে হবে। তাই শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন পাওয়ার পর ব্যাংক কীভাবে নতুন মূলধন সংগ্রহ করে এবং ভবিষ্যতের লভ্যাংশ নীতির সঙ্গে ব্যবসা সম্প্রসারণের ভারসাম্য রাখে, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

