শেয়ারবাজারে কোনো কোম্পানির শেয়ার ৫০ টাকা হলেই সেটি সস্তা, আর ৫০০ টাকা হলেই দামি এমন ধারণা খুবই প্রচলিত। আসল প্রশ্ন হলো, কোম্পানি যে আয় করছে এবং যে সম্পদ তৈরি করেছে, তার তুলনায় বাজারে শেয়ারটির দাম কতটা বেশি বা কম। এখানেই আসে পিই (P/E) ও পিবি (P/B) দুটি বহুল ব্যবহৃত মূল্যায়ন অনুপাত।
সহজ করে বললে, পিই দেখায় একজন বিনিয়োগকারী কোম্পানির প্রতি ১ টাকা আয়ের জন্য কত টাকা দিতে রাজি। আর পিবি দেখায় কোম্পানির হিসাবভুক্ত প্রতি ১ টাকা নিট সম্পদের বিপরীতে বাজারে বিনিয়োগকারীরা কত টাকা মূল্য দিচ্ছেন। পিই বের করতে শেয়ারের বাজারদরকে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস দিয়ে ভাগ করা হয়, আর পিবিতে বাজারদরকে শেয়ারপ্রতি বুক ভ্যালু দিয়ে ভাগ করা হয়। পেশাদার মূল্যায়নেও দুটিকে আলাদা পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হয়; কোন অনুপাত বেশি কার্যকর হবে, তা কোম্পানির ব্যবসার ধরন ও আর্থিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে।
এখন ধরুন, দুটি কোম্পানির শেয়ারের দামই ১০০ টাকা। প্রথম কোম্পানির ইপিএস ২০ টাকা হলে তার পিই ৫। অন্যদিকে দ্বিতীয় কোম্পানির ইপিএস মাত্র ৫ টাকা হলে পিই দাঁড়াবে ২০। অর্থাৎ একই ১০০ টাকার শেয়ারের মধ্যে দ্বিতীয়টির জন্য বিনিয়োগকারী আয়ের তুলনায় চার গুণ বেশি দাম দিচ্ছেন। এখানেই পিই-এর শক্তি কোম্পানি কতটা আয় করছে এবং সেই আয়ের তুলনায় বাজারদর কতটা উঁচু, তার একটি দ্রুত ধারণা পাওয়া যায়। তবে সমস্যা হলো, কোনো বছরের মুনাফা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে পিই খুব কম দেখাতে পারে; আবার লোকসান হলে পিই অর্থবহই থাকে না। এ কারণে শুধু একটি বছরের ইপিএস দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
পিবির গল্পটা একটু আলাদা। একটি ব্যাংকের কথা ভাবুন। ব্যাংকের মূল ব্যবসাই হলো আমানত সংগ্রহ করে ঋণ দেওয়া এবং সেই অর্থ থেকে আয় করা। ফলে তার সম্পদ, মূলধন, ঋণের মান এবং শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটির গুরুত্ব অনেক বেশি। এ ধরনের ব্যবসায় পিবি বেশ কার্যকর একটি সূচক হতে পারে। কিন্তু এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাঁদ আছে, বইয়ে থাকা সম্পদের মূল্য আর বাস্তবে সেই সম্পদ থেকে কত টাকা উদ্ধার করা যাবে, তা সবসময় এক নয়। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে ব্যাংকের বুক ভ্যালু নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতেই বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ। আইএমএফের ২০২৬ সালের বাংলাদেশ পর্যালোচনায় ২০২৫ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ মোট ঋণের ২৪.১ শতাংশে পৌঁছানোর তথ্য দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের রিটার্ন অন ইকুইটি ঋণাত্মক ছিল। ফলে শুধু ‘পিবি ১-এর নিচে’ দেখেই কোনো ব্যাংককে সস্তা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
বাংলাদেশের বাজারের কয়েকটি উদাহরণও বিষয়টি পরিষ্কার করে। জুলাই ২০২৬-এর কাছাকাছি তথ্য অনুযায়ী, প্রাইম ব্যাংকের পিই ছিল প্রায় ৪.১ এবং পিবি প্রায় ০.৮; ব্র্যাক ব্যাংকের ক্ষেত্রে পিই প্রায় ৬.৫ এবং পিবি প্রায় ১.০। আবার ঢাকা ব্যাংকের পিই প্রায় ৫.১ হলেও পিবি ছিল প্রায় ০.৫। অর্থাৎ একই খাতের কোম্পানির মধ্যেও দুটি অনুপাত একসঙ্গে না দেখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থাকে। বিশেষ করে কোনো ব্যাংকের পিবি কম হওয়ার কারণ হতে পারে বাজারের কম মূল্যায়ন, আবার হতে পারে সম্পদের মান, ভবিষ্যৎ মুনাফা বা করপোরেট গভর্ন্যান্স নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ।
এবার প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে বিশ্বের বড় বাজারগুলো কীভাবে দেখে? ভারতের বাজারে এখনো পিই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দ্রুত বাড়তে থাকা ভোগ্যপণ্য, প্রযুক্তি, শিল্প ও সেবা কোম্পানির মূল্যায়নে ভবিষ্যৎ আয় বড় বিষয়। জুন ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, এমএসসিআই ইন্ডিয়া সূচকের পিই ছিল ২৩.৩৬ এবং পিবি ৩.২৪। অর্থাৎ সেখানে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির বর্তমান সম্পদের তুলনায় ভবিষ্যৎ আয় ও প্রবৃদ্ধির জন্যও উল্লেখযোগ্য প্রিমিয়াম দিতে প্রস্তুত। ভারতের বাজার নিয়ে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও করপোরেট আয়ের পুনরুদ্ধার ও ২০২৭-২৮ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য আয় বৃদ্ধিকে মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ চালক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাপান আবার অন্য একটি শিক্ষা দেয়। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে কম পিবি-তে লেনদেন করা কোম্পানিগুলোকে বাজারে বেশি মূল্যায়নের দিকে আনার চেষ্টা হয়েছে। টোকিও স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানিগুলোকে মূলধনের খরচ ও শেয়ারের বাজারমূল্য নিয়ে সচেতন হয়ে ব্যবসা পরিচালনা এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে পরিকল্পনা প্রকাশের ওপর জোর দিয়েছে। ২০২৬ সালের একটি গবেষণাতেও দেখা গেছে, এই উদ্যোগের পর বিনিয়োগকারীরা বিশেষ করে কম পিবি এবং তুলনামূলক বেশি আরওই থাকা কোম্পানির দিকে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন। জুন ২০২৬-এ এমএসসিআই জাপান সূচকের পিই ছিল ২১.২৭ এবং পিবি ২.০৪। অর্থাৎ জাপানের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, কম পিবি নিজে কোনো জাদুর সংখ্যা নয়; কোম্পানি ওই সম্পদ দিয়ে কতটা মুনাফা তৈরি করছে, সেটাই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই আসলে পিই বনাম পিবির আসল লড়াই নয়, বরং পিই ও পিবিকে একসঙ্গে পড়ার প্রয়োজনীয়তা। একটি কোম্পানির পিই কম কিন্তু পিবি অনেক বেশি হলে বুঝতে হবে বাজার হয়তো ভবিষ্যৎ আয় বৃদ্ধির ওপর বড় প্রত্যাশা করছে। আবার পিবি কম কিন্তু আরওই দুর্বল হলে ‘সস্তা’ শেয়ারটি আসলে সস্তা নাও হতে পারে। পেশাদার মূল্যায়নেও পিবির সঙ্গে আরওই এবং পিইর সঙ্গে আয় বৃদ্ধির সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ শুধু অনুপাতের সংখ্যা নয়, সেই সংখ্যার পেছনে থাকা ব্যবসার বাস্তবতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের জন্য তাই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে কোম্পানি বুঝে অনুপাত বেছে নেওয়া। ব্যাংক, বিমা বা সম্পদনির্ভর প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পিবি, আরওই, সম্পদের মান ও মূলধন পরিস্থিতি একসঙ্গে দেখা দরকার। অন্যদিকে উৎপাদন, ভোগ্যপণ্য, প্রযুক্তি বা দ্রুত বাড়তে থাকা সেবা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পিই, আয় বৃদ্ধির হার, মুনাফার মান এবং ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বাজারে কোনো শেয়ার ০.৫ পিবিতে পাওয়া যাচ্ছে বলেই সেটি সস্তা নয়, আবার ২০ পিই মানেই সেটি অতিরিক্ত দামি এমন সরল হিসাবও ঠিক নয়।
শেষ পর্যন্ত একজন বিনিয়োগকারী যখন স্ক্রিনে একটি শেয়ারের দাম দেখেন, তখন আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘দাম কত?’ নয়, ‘এই দামের বিপরীতে আমি কী পাচ্ছি?’ পিই বলে দেয় আয়ের বিপরীতে কত দাম দিচ্ছেন, পিবি বলে দেয় কোম্পানির সম্পদের বিপরীতে কত দাম দিচ্ছেন। আর এই দুইয়ের সঙ্গে আরওই, আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা, ঋণের মান, নগদ প্রবাহ ও ব্যবসার ভবিষ্যৎ মিলিয়ে দেখলেই বোঝা সম্ভব শেয়ারটি সত্যিই সস্তা, নাকি শুধু সস্তা দেখাচ্ছে।

