পুঁজিবাজারে ধার করে শেয়ার কেনার নিয়ম আরও নির্দিষ্ট করতে মার্জিন বিধিমালায় নতুন পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বিনিয়োগকারীর ইক্যুইটি ও মার্জিন অর্থায়নের অনুপাত সর্বোচ্চ ১:১ করার পাশাপাশি, হিসাবে ইক্যুইটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে গেলে শেয়ার বিক্রির সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এগুলো এখনো খসড়া প্রস্তাব, চূড়ান্ত বিধিমালা নয়। বিএসইসি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে খসড়া প্রকাশ করে মতামত চেয়েছে এবং ৩ আগস্টও সংশোধনী-সংক্রান্ত খসড়া মতামতের জন্য তালিকাভুক্ত ছিল।
১০০ টাকা নিজের, ১০০ টাকা ঋণ ঝুঁকিটা কোথায়?
মার্জিন ঋণের বিষয়টি সহজ করে ভাবলে, একজন বিনিয়োগকারী নিজের ১০০ টাকা দিয়ে আরও ১০০ টাকা ধার নিয়ে শেয়ার কিনলেন। অর্থাৎ মোট ২০০ টাকার শেয়ারে তার নিজের অর্থ ১০০ টাকা, আর ঋণ ১০০ টাকা। প্রস্তাবিত নিয়মে এর বেশি ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীর ইক্যুইটির চেয়ে মার্জিন অর্থায়ন বেশি হতে পারবে না।
এতে একদিকে বিনিয়োগকারীর অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে শেয়ারের দাম পড়ে গেলে লোকসান দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনাও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কারণ ধার করা টাকা দিয়ে শেয়ার কেনার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শেয়ারের দাম কমলেও ঋণের টাকা কিন্তু কমে না। ফলে বাজারে ১০ শতাংশ পতন একজন নগদ বিনিয়োগকারীর জন্য যতটা ক্ষতি, একই পতন মার্জিন ঋণ নেওয়া বিনিয়োগকারীর জন্য ইক্যুইটির ওপর অনেক বেশি চাপ তৈরি করতে পারে।
৫০ শতাংশ ইক্যুইটি আসলে কী বোঝায়?
প্রস্তাবিত কাঠামোয় মার্জিন হিসাবে বিনিয়োগকারীর ইক্যুইটি মোট মার্জিন অর্থায়নের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী তার প্রকৃত মূলধন বা নিট সম্পদের চার গুণের বেশি অর্থায়ন করতে পারবে না এমন সীমাও প্রস্তাব করা হয়েছে।
এখানে ‘ইক্যুইটি’ বলতে বিনিয়োগকারীর নিজের অর্থ বা ঋণ বাদ দেওয়ার পর হিসাবের প্রকৃত মালিকানা মূল্য বোঝানো হচ্ছে। ফলে বাজারদর কমে গেলে সেই ইক্যুইটি দ্রুত কমে যেতে পারে। আর সেখানেই আসে মার্জিন কল।
প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্ধারিত সীমার নিচে ইক্যুইটি নেমে গেলে অর্থায়নকারীকে গ্রাহককে মার্জিন কল দিতে হবে। লিখিতভাবে, ই-মেইল বা নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে বার্তার মাধ্যমে এই নোটিশ দেওয়া যাবে। মার্জিন কলের তিন ট্রেডিং দিবস পরও প্রয়োজনীয় অর্থ বা সিকিউরিটি সমন্বয় না করলে নতুন করে অর্থায়ন বন্ধ থাকবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শেয়ার বিক্রি করে ইক্যুইটি সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে।
২৫ শতাংশে গিয়ে আর অপেক্ষা নয়
সবচেয়ে কঠোর প্রস্তাবটি হলো, কোনো গ্রাহকের ইক্যুইটি মার্জিন অর্থায়নের ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে প্রয়োজনীয় সিকিউরিটি আগাম নোটিশ ছাড়াই বিক্রি করার ক্ষমতা অর্থায়নকারীকে দেওয়ার প্রস্তাব।
এটি আসলে ‘ফোর্স সেল’ বা বাধ্যতামূলক বিক্রির ব্যবস্থা। ধরুন, কোনো বিনিয়োগকারী নিজের ১০০ টাকা এবং ১০০ টাকা ঋণ নিয়ে ২০০ টাকার শেয়ার কিনেছেন। শেয়ারের দাম পড়ে গিয়ে তার ইক্যুইটি যদি ৫০ টাকার নিচে চলে যায়, তখন ঝুঁকি সামলাতে অর্থায়নকারীকে শেয়ার বিক্রি করতে হতে পারে। প্রস্তাবিত ২৫ শতাংশ সীমা আরও নিচের একটি সুরক্ষা-সীমা হিসেবে কাজ করবে।
তবে এখানেই বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। একসঙ্গে অনেক বিনিয়োগকারীর ইক্যুইটি কমে গেলে যদি একই সময়ে শেয়ার বিক্রি শুরু হয়, তাহলে সেই বিক্রির চাপ আবার শেয়ারের দাম আরও কমিয়ে দিতে পারে। তখন একজনের ফোর্স সেল অন্য বিনিয়োগকারীর মার্জিন কলের কারণ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ ঝুঁকি কমানোর যে ব্যবস্থা, বাজারের তীব্র পতনের সময় সেটিই আবার বিক্রির চাপ বাড়াতে পারে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে অতীতেও মার্জিন ঋণ ও ফোর্স সেল নিয়ে এমন ঝুঁকির আলোচনা হয়েছে।
সব শেয়ারে মার্জিন ঋণ নয়
প্রস্তাবিত বিধিমালায় শুধু ঋণের পরিমাণ নয়, কোন শেয়ারে সেই ঋণ দেওয়া যাবে সেটিও কঠোরভাবে নির্ধারণের উদ্যোগ রয়েছে। তালিকাভুক্ত সাধারণ শেয়ারের বাইরে ‘জি’, ‘এন’ ও ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ার এবং এসএমই, এটিবি ও ওটিসি প্ল্যাটফর্মে থাকা সিকিউরিটিজকে মার্জিন অর্থায়নের বাইরে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
মার্জিন সুবিধা নিতে বিনিয়োগকারীর হিসাবে অন্তত ৩ লাখ টাকার তালিকাভুক্ত সিকিউরিটি থাকার প্রস্তাবও রয়েছে। অর্থাৎ নতুন কাঠামো একদিকে ঋণের সুযোগ কিছু ক্ষেত্রে সহজ করতে চাইছে, আবার অন্যদিকে একেবারে দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ সিকিউরিটিতে সেই ঋণ যাওয়ার পথ বন্ধ রাখতে চাইছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো মূল্যায়নের শর্ত। প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো শেয়ারের পিই রেশিও ৪০-এর বেশি হলে বা শেয়ারপ্রতি আয় ঋণাত্মক হলে সেটিতে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। তালিকাভুক্ত জীবন বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পিইর পরিবর্তে পিবি রেশিও বিবেচনার কথা বলা হয়েছে; সেখানে পিবি রেশিও ৩-এর বেশি হলে বা নিট সম্পদ মূল্য ঋণাত্মক হলে মার্জিন সুবিধা না দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
বাজার চাঙা করতে ঋণ, নাকি ঝুঁকি কমাতে নিয়ন্ত্রণ?
বিএসইসির এই উদ্যোগের পেছনে দুটি লক্ষ্য একসঙ্গে কাজ করছে বলে বোঝা যায়। একদিকে পুঁজিবাজারে তারল্য ও লেনদেন বাড়াতে মার্জিন অর্থায়নের কাঠামোকে আরও ব্যবহারযোগ্য করা, অন্যদিকে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো। কমিশন জানিয়েছে, খসড়া সংশোধনের উদ্দেশ্য হলো বিদ্যমান কাঠামোকে বর্তমান বাজারের সঙ্গে আরও বাস্তবসম্মত করা, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
তবে নিয়ম সহজ করলেই বাজারে টাকা ঢুকবে এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং প্রশ্ন হলো, বিনিয়োগকারীরা সেই ঋণ কীভাবে ব্যবহার করছেন। ভালো কোম্পানির মৌলভিত্তি দেখে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য ঋণ নেওয়া আর দ্রুত শেয়ারদর বাড়বে ধরে নিয়ে ধার করে কেনা দুটি এক জিনিস নয়।
এর আগে বিএসইসির প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, বিশেষ করে জীবন বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পিবি রেশিওকে শর্ত হিসেবে যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে। বিএসইসি চেয়ারম্যানও জানিয়েছিলেন, অংশীজনদের মতামতের পর খসড়াটি পর্যালোচনা করা হবে এবং এটি তখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল না।
আসল পরীক্ষা হবে ‘ফোর্স সেল’ কতটা নিয়ন্ত্রিত থাকে
মার্জিন ঋণের নতুন কাঠামো কার্যকর হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে নিয়ম লেখা নয়, নিয়ম প্রয়োগের পদ্ধতি। কোনো বিনিয়োগকারীর শেয়ার বিক্রি করার আগে তাকে কতটা সময় দেওয়া হচ্ছে, বাজারের অস্বাভাবিক পতনের সময় কীভাবে ঝুঁকি সামলানো হবে, অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান নিজের ঝুঁকি কতটা পর্যবেক্ষণ করবে এসব প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এ কারণেই প্রস্তাবিত বিধিমালায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি, আলাদা ব্যাংক হিসাব, একক শেয়ারে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ অর্থায়ন এবং গবেষণা দলের পারিশ্রমিককে ট্রেডিং কমিশনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না করার মতো বিষয়ও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ বিএসইসি শুধু বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি নয়, মার্জিন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মনে রাখা দরকার মার্জিন ঋণ বিনিয়োগকারীর লাভকে যেমন বাড়াতে পারে, লোকসানও তেমনি দ্রুত বাড়াতে পারে। নিজের ১০০ টাকার সঙ্গে আরও ১০০ টাকা ধার করে ২০০ টাকার শেয়ার কেনা শুনতে আকর্ষণীয়। কিন্তু শেয়ারদর ২০ শতাংশ কমে গেলে ক্ষতির চাপ নিজের মূলধনের ওপর অনেক বেশি পড়ে। আর বাজার একসঙ্গে নামলে সেই চাপ ব্যক্তিগত হিসাব ছাড়িয়ে পুরো বাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই নতুন নিয়মের সাফল্য শুধু কতজন বেশি মার্জিন ঋণ পেলেন, তা দিয়ে মাপা যাবে না; বরং বাজার পড়ার সময় কতটা সুশৃঙ্খলভাবে ঝুঁকি সামলানো গেল, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।

