টানা চার কার্যদিবস ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর সোমবার দিনের শুরুতেই দেশের শেয়ারবাজারে দেখা দিয়েছে নেতিবাচক প্রবণতা। সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের শুরুতেই প্রধান সূচকগুলো কমে যায়।
সরকার বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশের চারটি প্রধান পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পর ব্যবসা ও শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, জ্বালানি খরচ বেড়ে গেলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ভবিষ্যতে কোম্পানিগুলোর মুনাফায় চাপ তৈরি করতে পারে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজার সাধারণত অর্থনীতির সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া দ্রুত দেখায়। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব পড়তে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি হয়েছে।
সোমবার সকাল ১১টা পর্যন্ত লেনদেনের প্রথম এক ঘণ্টায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৯ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫৮৩ পয়েন্টে অবস্থান করে। শতাংশের হিসাবে সূচকটি কমেছে শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ।
বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ডিএস৩০ সূচকও কমেছে। সূচকটি ৬ পয়েন্ট হারিয়ে ২ হাজার ১৪ পয়েন্টে নেমে এসেছে। একই সময়ে শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএসইএস ৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১১৩ পয়েন্টে।
লেনদেনের শুরুতে বাজারে বিক্রির চাপ তুলনামূলক বেশি ছিল। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ১৬৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমেছে, বিপরীতে ১৪৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। ৭৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর অপরিবর্তিত ছিল।
দিনের প্রথম এক ঘণ্টায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মোট লেনদেন হয়েছে ২৯৪ কোটি টাকা। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ারে। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৫ কোটি ৯০ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে।
দেশীয় পরিস্থিতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিবেশও বিনিয়োগকারীদের আচরণে প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ গত বুধবার তাদের মূল সুদের হার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়িয়েছে। এর ফলে সুদের হার ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিবেশে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফেডারেল রিজার্ভ ভবিষ্যতেও কঠোর নীতি অব্যাহত রাখতে পারে। এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে সতর্ক মনোভাব তৈরি করছে।
তবে দেশের আরেক পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে দিনের শুরুতে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেখানে লেনদেনের প্রথম পর্যায়ে বাজার ইতিবাচক ছিল। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের অল শেয়ার প্রাইস ইনডেক্স বা ক্যাসপি ১০ পয়েন্ট বেড়ে ১৪ হাজার ৮৬৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের নির্বাচিত কোম্পানিগুলোর সূচক সিএসসিএক্স ৭ পয়েন্ট বেড়ে ৯ হাজার ১১৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির তাৎক্ষণিক প্রভাব বাজারে দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি নির্ভর করবে কোম্পানিগুলো বাড়তি ব্যয় কতটা সামাল দিতে পারে তার ওপর। যেসব শিল্প জ্বালানি ও পরিবহন খরচের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের জন্য ব্যয়ের চাপ বাড়তে পারে।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে পারে বা বাড়তি খরচ বাজারে সমন্বয় করতে সক্ষম হয়, তাহলে প্রভাব তুলনামূলক কম হতে পারে। এখন বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে কোম্পানিগুলোর আয়, উৎপাদন ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে।
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পর দেশের পুঁজিবাজারে আস্থা ধরে রাখা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সামনে বাজারের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতার ওপর।

