দেশের পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ প্রদানের নিয়মকানুনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। নতুন সংশোধনীর ফলে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ প্রদানের সক্ষমতা যেমন বেড়েছে, তেমনি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় বেশ কিছু নতুন শর্তও যুক্ত হয়েছে।
গত ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘মার্জিন বিধিমালা ২০২৫’-এর বিভিন্ন ধারা সংশোধন করা হয়। গত বছরের নভেম্বর মাসে এই বিধিমালা প্রথম চূড়ান্ত করা হয়েছিল। নতুন সংশোধনীতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো, মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তাদের নিজস্ব কোর ক্যাপিটাল বা নিট সম্পদের সর্বোচ্চ চার গুণ পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করতে পারবে, যেখানে আগে এই সীমা ছিল তিন গুণ। তবে ব্যক্তি পর্যায়ে একজন গ্রাহকের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব ইকুইটির বেশি মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে না—অর্থাৎ গ্রাহকের ইকুইটি ও ঋণের অনুপাত সর্বোচ্চ সমান-সমান রাখতে হবে।
একক কোনো শেয়ারে অর্থায়ন কেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগও বাড়ানো হয়েছে। নতুন নিয়মে একটি নির্দিষ্ট সিকিউরিটিতে মোট বকেয়া মার্জিন অর্থায়নের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে।
কোন কোন শেয়ারে মার্জিন ঋণ পাওয়া যাবে, তা নির্ধারণের মানদণ্ডও কিছুটা শিথিল হয়েছে। আগে মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও ৩০-এর মধ্যে থাকা শেয়ারেই কেবল মার্জিন সুবিধা মিলত, নতুন নিয়মে এই সীমা বাড়িয়ে ৪০ করা হয়েছে। তবে কোনো কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় ঋণাত্মক হলে সেই শেয়ারে কোনোভাবেই মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। জীবন বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে অবশ্য ভিন্ন মানদণ্ড রাখা হয়েছে—পিই রেশিওর পরিবর্তে সেখানে প্রাইস-টু-বুক রেশিও বিবেচনা করা হবে, যা তিনের বেশি হলে বা নিট সম্পদমূল্য ঋণাত্মক হলে অর্থায়নের সুযোগ থাকবে না।
গ্রাহক সুরক্ষার দিক থেকে একটি নতুন শর্তও যুক্ত হয়েছে বিধিমালায়। এখন থেকে মার্জিন হিসাব খুলতে হলে গ্রাহকের তালিকাভুক্ত শেয়ারে ন্যূনতম ৩ লাখ টাকার বিনিয়োগ থাকতে হবে; এর কম থাকলে সেই হিসাবে কোনো ঋণ সুবিধা মিলবে না। পাশাপাশি, গ্রাহক নিজের নগদ অর্থে মার্জিন-অযোগ্য কোনো শেয়ার কিনলে সেটির মূল্য তার ইকুইটি হিসেবে গণনায় ধরা হবে না।
গ্রাহকের হিসাবে ইকুইটি ধরে রাখার নিয়মেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। কোনো মার্জিন হিসাবে গ্রাহকের ইকুইটি মোট অর্থায়নের ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে গ্রাহককে মার্জিন কল দিতে হবে—লিখিতভাবে, ই-মেইলে বা অন্য কোনো অনুমোদিত মাধ্যমে। এই নোটিশের পর তিন কার্যদিবসের মধ্যে গ্রাহক প্রয়োজনীয় অর্থ জমা না দিলে বা ইকুইটি নির্ধারিত মাত্রায় না আনলে তাকে নতুন করে কোনো ঋণ সুবিধা দেওয়া যাবে না। এই পরিস্থিতিতে গ্রাহকের ইকুইটি ৫০ শতাংশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় শেয়ার বিক্রি করার সুযোগও দেওয়া হয়েছে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে অর্থাৎ ইকুইটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে কঠোরতম ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে নতুন নিয়মে। এমন ক্ষেত্রে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই গ্রাহকের প্রয়োজনীয়সংখ্যক শেয়ার বাধ্যতামূলকভাবে বিক্রি করে দিতে হবে। তবে এই বিক্রয় আদেশ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর না হলে বা বিলম্বে কার্যকর হলে, তার ফলে সৃষ্ট ক্ষতির দায় অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তাবে না—এমন সুরক্ষামূলক শর্তও যুক্ত করা হয়েছে।
মার্জিন অর্থায়নের আওতা নিয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সংশোধিত বিধিতে। স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সাধারণ শেয়ার ছাড়া অন্য কোনো ধরনের সিকিউরিটিতে এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিভুক্ত শেয়ার এবং এসএমই, এটিবি বা ওটিসি প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত কোনো সিকিউরিটিতেও মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে না।
আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্জিন সংক্রান্ত লেনদেনের জন্য একটি পৃথক ব্যাংক হিসাব রাখতে হবে, যা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো শাখা অফিস বা ডিজিটাল বুথের নামে আলাদা মার্জিন হিসাব খোলার সুযোগও রাখা হয়নি নতুন নিয়মে। এ ধরনের হিসাব ইতিমধ্যে চালু থাকলে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ কমিশনের অনুমোদন ছাড়া তা পরিচালনা করা যাবে না বলেও সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ঋণসীমা বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে তারল্য প্রবাহ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে, তবে একই সঙ্গে যুক্ত হওয়া কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

