শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার পর অনেক ব্যক্তি বিনিয়োগকারী নানা কারণে তাদের প্রাপ্য লভ্যাংশ তুলে নেননি। কেউ কেউ আবার মারা যাওয়ার পর তাদের উত্তরাধিকারীরাও সেই অর্থের দাবি জানাননি। এই সুযোগে বছরের পর বছর ধরে সেই অর্থ ব্যবহার করে সুবিধা নিয়েছে বিভিন্ন কোম্পানি, এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠান সেই টাকা আত্মসাৎও করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই সমস্যা সমাধানে ২০২১ সালে সরকার প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে ক্যাপিটাল মার্কেট স্টেবিলাইজেশন ফান্ড নামে একটি তহবিল গঠন করেছিল। এই তহবিল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক একজন চেয়ারম্যানকে। তবে শুরু থেকেই তহবিলের পরিচালনা নিয়ে বিতর্ক লেগেই ছিল, আর প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা তেমন কোনো সুফল পাননি।
এই তহবিলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারী। তাদের ভাষ্যমতে, তহবিলের সুবিধা প্রকৃতপক্ষে কেউ পেয়েছেন কিনা, তা স্পষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে তহবিলটি গঠিত হয়ে থাকলে তার সুফল তাদের কাছেই পৌঁছানো উচিত ছিল। এমনকি এই অর্থ এখনো তহবিলে অবশিষ্ট আছে কিনা, সে বিষয়েও অনেক বিনিয়োগকারীর স্পষ্ট ধারণা নেই।
তবে তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই তহবিল থেকে বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে—যা মূল সংগৃহীত অর্থের তুলনায় খুবই সামান্য। এদিকে চার বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানি তাদের কাছে জমে থাকা অদাবিকৃত নগদ ও বোনাস লভ্যাংশের অর্থ এখনো এই তহবিলে জমা দেয়নি। উল্লেখ্য, তহবিল গঠনের মূল লক্ষ্য ছিল বাজারে টানা দরপতনের সময় শেয়ার কিনে বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে তহবিলটি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় সংশ্লিষ্টরা একে নতুন করে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট মন্তব্য করেন, তহবিলটি সঠিকভাবে পরিচালিত না হওয়ার কারণেই এটি কার্যকর হয়নি। তার মতে, তহবিলের অর্থ নিয়মিত পুনর্বিনিয়োগ বা সঞ্চালনের যে কাজ করার কথা ছিল, তা করা হয়নি। তিনি মনে করেন, পুরো ব্যবস্থাটি নতুন করে সাজিয়ে সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুনের ভিত্তিতে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালনা করা প্রয়োজন, শুধু কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে রেখে দিলে তা কার্যকর হবে না।
এই সমস্যা সমাধানে ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বর্তমানে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের অধীনে থাকা সংশ্লিষ্ট আইনটি পরিবর্তন করে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। নতুন আইনে তহবিলের অর্থ দিয়ে সরাসরি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বিধান বাতিল করা হবে। তবে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দাবির আবেদন ১৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার বিদ্যমান বিধান বহাল থাকবে। পার্থক্য হলো, এখন থেকে আবেদন করতে হবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছে নয়, বরং সরাসরি তহবিল কর্তৃপক্ষের কাছে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারী বা তাদের উত্তরাধিকারীরা আজীবন যেকোনো সময় অদাবিকৃত লভ্যাংশের দাবি জানাতে পারবেন। নতুন কাঠামোয় গঠিত প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হবে মূলত ব্যাংক আমানতের সুদ আয় থেকে।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সতর্ক করে বলছেন, মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর অবণ্টিত লভ্যাংশের অর্থ একযোগে তুলে নিলে বাজারে তারল্য সংকট তৈরি হতে পারে। তাই যারা প্রকৃতপক্ষে প্রতারণা করেছে, শুধু তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। একজন পুঁজিবাজার বিশ্লেষক এ প্রসঙ্গে বলেন, অনেক কোম্পানি বছরের পর বছর লভ্যাংশ প্রদান না করলেও বিনিয়োগকারীরাও নিজ থেকে সেই অর্থের খোঁজ নেননি। এতদিন সেই অর্থ কোম্পানির মূলধন হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যা হঠাৎ তহবিলে স্থানান্তর করলে কোম্পানির নগদ প্রবাহে চাপ তৈরি হতে পারে। তার মতে, সব কোম্পানিই যে অর্থ আত্মসাৎ করে, এমনটা নয়—বরং হাতে গোনা কয়েকটি প্রতারণার উদাহরণকে সাধারণীকরণ করে সামগ্রিক লভ্যাংশের অর্থকে ঝুঁকিপূর্ণ ভাবা ঠিক হবে না।
নতুন আইনে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে তদন্ত পরিচালনা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোনো প্রতিষ্ঠান এই নির্দেশনা না মানলে ন্যূনতম এক লাখ টাকা জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে নতুন আইনে।

