পুঁজিবাজারে শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কিন্তু ন্যাশনাল টি কোম্পানির শেয়ার নিয়ে ঘটেছে একেবারে ভিন্ন এক ঘটনা। দাম বাড়ানোর কৌশল নিতে গিয়ে শেষমেশ বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছেন কারসাজির সঙ্গে জড়িতরা নিজেরাই। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের যৌথ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এই তথ্য।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, এই কারসাজির ঘটনায় মোট রিয়েলাইজড ও আনরিয়েলাইজড লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ কোটি টাকারও বেশি। সহজ ভাষায় বললে, শেয়ার লোকসানে বিক্রি করলে যে ক্ষতি হয়, সেটিই রিয়েলাইজড লোকসান। আর শেয়ার হাতে রেখে দিলেও বাজারদর কমে যাওয়ায় যে কাগজে-কলমে ক্ষতি তৈরি হয়, সেটি আনরিয়েলাইজড লোকসান নামে পরিচিত, যা পরবর্তীতে দাম বাড়লে পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সময়রেখা। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট থেকে ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মাত্র আঠারো কার্যদিবসেই কোম্পানিটির শেয়ারদর ২৭০ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বেড়ে পৌঁছে যায় ৪৮৬ টাকা ৯০ পয়সায়। এই স্বল্প সময়ে দর বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় আশি শতাংশ, যা স্বাভাবিক বাজার আচরণ থেকে অনেকটাই ব্যতিক্রম। তবে এই কৃত্রিম উচ্চ দর বেশিদিন টেকেনি। ১৩ অক্টোবর থেকে শুরু হয় টানা দরপতন, এবং দেড় মাসের মধ্যেই দাম প্রায় একষট্টি শতাংশ কমে নেমে আসে ১৮৯ টাকা ৯০ পয়সায়। এরপরও পতন থামেনি। সর্বশেষ লেনদেন অনুযায়ী শেয়ারটির দর দাঁড়িয়েছে ১৬৫ টাকা ২০ পয়সায়।
তদন্তকারীদের ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই একটি বিশেষ চক্র পরিকল্পিতভাবে এই শেয়ারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে দর বাড়ানোর কৌশল নেয়। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে নাম এসেছে সরওয়ার কামালের। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন ব্যক্তি এবং দুটি প্রতিষ্ঠানের বিও হিসাবের মধ্যে সমন্বিত লেনদেনের প্রমাণও পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
হিসাব বলছে, ১৯ আগস্ট থেকে ৭ অক্টোবরের মধ্যে এই চক্র মোট পাঁচ লাখের বেশি শেয়ার কিনে নেয়, যার সিংহভাগই কেনেন সরওয়ার কামাল একাই। ওই সময়ে বাজারে হওয়া মোট লেনদেনের প্রায় অর্ধেকই ছিল তার একার কেনা শেয়ার। পুরো চক্র মিলিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছিল মোট লেনদেনের প্রায় নব্বই শতাংশ। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একটি নির্দিষ্ট দিনে মাত্র দশ মিনিটের ব্যবধানে বাজারে হওয়া প্রায় সব শেয়ারই কিনে নেওয়া হয়— যা কৃত্রিম চাহিদা তৈরির স্পষ্ট নমুনা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পরের কয়েক দিনেও একই কৌশলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কিনে দর বাড়ানো হয়।
তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, এই চক্রের হাতে আগে থেকেই উচ্চ দামে কেনা প্রচুর শেয়ার মজুত ছিল। মূল লক্ষ্য ছিল দর বাড়িয়ে সেই পুরোনো বিনিয়োগ থেকে মুনাফা তোলা। কিন্তু পরিকল্পনা মতো দর ধরে রাখা যায়নি— বরং দ্রুতই নিম্নমুখী হতে থাকে বাজার। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাধ্য হয়ে লোকসানেই শেয়ার বিক্রি শুরু করেন তারা।
গড়ে প্রায় ৪৬৫ টাকায় কেনা শেয়ার শেষমেশ প্রায় বিয়াল্লিশ শতাংশ কমদামে বিক্রি করতে বাধ্য হন সংশ্লিষ্টরা। এতে তাদের রিয়েলাইজড লোকসান দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকা, আর হাতে থাকা শেয়ারের আনরিয়েলাইজড লোকসান ছাড়িয়ে যায় দশ কোটি টাকা।
তদন্তে আরও একটি প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে— ইকুইটি রিসোর্সেস লিমিটেড। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এক দিনেই প্রতিষ্ঠানটি কিনে নেয় বাজারে হওয়া মোট শেয়ারের প্রায় সত্তর শতাংশ। পরে প্রতিষ্ঠানটির একজন প্রতিনিধি কোম্পানির পরিচালক পদেও নির্বাচিত হন। তবে এই বিনিয়োগও শেষ পর্যন্ত লাভজনক হয়নি— প্রতিষ্ঠানটির আনরিয়েলাইজড লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে বিশ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে সরওয়ার কামাল ও তার সহযোগীদের রিয়েলাইজড-আনরিয়েলাইজড লোকসান এবং ইকুইটি রিসোর্সেসের ক্ষতি একত্র করলে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৬ কোটি টাকারও বেশি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি জানিয়েছে, কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা অনিবার্য। সংস্থাটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, বাজারে কারসাজি প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং লোকসান হলেও কেউ দায়মুক্তি পাবেন না।
এদিকে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থাও রীতিমতো উদ্বেগজনক। সবশেষ অর্থবছরে ন্যাশনাল টি কোম্পানির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে একশ চার কোটি টাকার বেশি। শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১৫৮ টাকা ৫৩ পয়সা, আর নেট অ্যাসেট ভ্যালু নেমে গেছে ঋণাত্মক পর্যায়ে। পরিচালন কার্যক্রম থেকেও নগদ প্রবাহ নেতিবাচক থেকেছে। ১৯৭৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এই প্রতিষ্ঠান গত তিন বছর ধরে বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি, সর্বশেষ ২০২২ সালে দিয়েছিল সাড়ে সাত শতাংশ। দীর্ঘদিন লভ্যাংশবঞ্চিত থাকায় বর্তমানে শেয়ারটি জেড ক্যাটাগরিতে লেনদেন হচ্ছে।
কোম্পানিটির শেয়ার বিন্যাসেও চোখ রাখলে দেখা যায়, মোট শেয়ারের প্রায় চল্লিশ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে, সরকারের মালিকানায় প্রায় পাঁচ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে প্রায় চব্বিশ শতাংশ শেয়ার।
সার্বিক এই ঘটনা পুঁজিবাজারে কারসাজিবিরোধী নজরদারি আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির প্রবণতা চিহ্নিত করতে বাজার তদারকি ব্যবস্থা আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও সক্রিয় করা প্রয়োজন, যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এমন কৃত্রিম উত্থান-পতনের শিকার না হন।

