পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং আন্তর্জাতিক মানের শাসন প্রতিষ্ঠায় ডিএসই বোর্ডের গঠন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ডিএসইর সক্রিয় ২৯২টি ব্রোকারেজ ফার্মের মধ্যে মাত্র ৫৯টি ইনস্টিটিউশনাল; যারা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগী সংস্থা। বাকিগুলো একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়েছে। অথচ শীর্ষ ৪০টি ব্রোকারেজ ফার্ম, যারা মূলত ইনস্টিটিউশনাল, ২০২৬ অর্থবছরে দৈনিক লেনদেনের ৭০ শতাংশের বেশি পরিচালনা করছে। কিন্তু ডিএসই বোর্ডে তাদের কোনো প্রতিনিধি নেই, কারণ বোর্ড সদস্য নির্বাচনে তারা সংখ্যালঘু।
ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম অনুযায়ী ডিএসই বোর্ডে ১২ সদস্য থাকেন। এর মধ্যে ছয়জন স্বতন্ত্র পরিচালক, চারজন শেয়ারহোল্ডার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, একজন কৌশলগত অংশীদার এবং ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক দ্বাদশ সদস্য। কিন্তু এই কাঠামোই যেন সংস্কারের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেয়ারহোল্ডার পরিচালকরা সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থে কাজ করেন, অন্যদিকে স্বতন্ত্র পরিচালকরাও নিয়ম প্রয়োগে তেমন কার্যকর নন; বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, তারা মূলত সম্মানী ও কর্পোরেট মর্যাদার জন্যই বোর্ডে আসেন। ইনস্টিটিউশনাল ব্রোকারেজ ফার্মগুলোর সিনিয়র নির্বাহীরা মনে করছেন, একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সিন্ডিকেট এমন প্রার্থীদের সমর্থন করে যারা ডিএসই বোর্ডে তাদের স্বার্থ হাসিল করতে পারে।
ছোট ব্রোকারদের এই আধিপত্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল)। ছয় বছর আগে গঠিত এই ক্লিয়ারিং কোম্পানিটি এখনও চালু হয়নি। ডিএসই, যার সিসিবিএলে ৪৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে, কোম্পানিটি নিবন্ধনের কাজ এগিয়ে নেয়নি। সিসিবিএলকে বিএসইসির কাছে নিবন্ধিত হতে হবে। কিন্তু ডিএসইর শেয়ারহোল্ডার পরিচালকরা সিসিবিএলের প্রস্তাবিত বোর্ড কাঠামো, যেখানে ডিএসই থেকে দুজন স্বতন্ত্র পরিচালক থাকবেন, গ্রহণ করেননি। অথচ একটি ক্লিয়ারিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা জরুরি, কারণ এটি লেনদেন নিষ্পত্তি দ্রুত করতে এবং নতুন ডেরিভেটিভস চালু করতে সহায়তা করবে।
অন্যদিকে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) দীর্ঘদিন ধরেই ডিএসই বোর্ডের কাঠামো সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। তারা বোর্ডে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডার পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ডিবিএর মতে, বর্তমান কাঠামোতে স্বতন্ত্র পরিচালকদের আধিপত্য বাজারের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে। তবে সমালোচকরা মনে করছেন, এই দাবির পেছনে মূলত ছোট ব্রোকারদের নিজস্ব স্বার্থই কাজ করছে।
বিএসইসি ইতিমধ্যে পুঁজিবাজার সংস্কারে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি তারা ডিএসইকে ব্রোকারেজ ফার্মগুলোর রুটিন পরিদর্শনের দায়িত্ব দিয়েছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বাজার নজরদারি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি ডিএসই ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার তৈরি করছে যা ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ক্লায়েন্ট তথ্য বা লেনদেনের রেকর্ড পরিবর্তন করতে বাধা দেবে।
কিন্তু এই সংস্কার উদ্যোগগুলো কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করছে ডিএসই বোর্ডের গঠনের ওপর। যতদিন বোর্ডে ইনস্টিটিউশনাল ব্রোকারদের প্রতিনিধিত্ব না থাকবে, ততদিন পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিএসই বোর্ডে অন্তত দুজন শীর্ষ ইনস্টিটিউশনাল ব্রোকারের প্রতিনিধি থাকা উচিত। অন্যথায় ছোট ব্রোকারদের সিন্ডিকেটের প্রভাবে বাজার সংস্কার আটকে থাকবে, এবং দেশের পুঁজিবাজার আধুনিকায়নের পথে এগোতে পারবে না।

