পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান; ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এখন অবসায়নের (লিকুইডেশন) মুখে। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১০ আগস্ট ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর আওতায় এগুলোর বিরুদ্ধে রেজল্যুশন প্রক্রিয়া শুরু করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে বলেছে, এই তিনটি এনবিএফআই অবসায়ন বা তালিকাচ্যুত করার আগে যেন শেয়ারহোল্ডারদের বৈধ স্বার্থ সুরক্ষিত করা হয়। কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সংকটের ভারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পড়তে দেওয়া যাবে না।
বিএসইসি তাদের প্রস্তাবে বলেছে, রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় সরকার যদি কোনো পক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেয়, তাহলে তার একটি অংশ যেন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। পাশাপাশি, অবসায়নের আগে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থের সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি প্রক্রিয়া চালু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কমিশন আরও জানিয়েছে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ মূল্যায়ন ও প্রকাশ না করে এই তিনটি কোম্পানি অবসায়ন বা তালিকাচ্যুত করা যাবে না। বিকল্প হিসেবে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের জন্য একটি মূল্য নির্ধারণ করে তা সর্বসাধারণের জানানোরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তিনটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ফারইস্ট ফাইন্যান্সের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২৫ সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল মাইনাস ৩.৭৫ টাকা, আর শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদের মূল্য (এনএভি) ছিল মাইনাস ৫৪.২৩ টাকা। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ইপিএস ছিল মাইনাস ৬.৭১ টাকা এবং এনএভি ছিল মাইনাস ২১৯.০৩ টাকা। আর এফএএস ফাইন্যান্সের চিত্র আরও ভয়াবহ, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে তাদের ইপিএস ছিল মাইনাস ১০.৩৪ টাকা এবং এনএভি ছিল মাইনাস ১৫৮.৩৯ টাকা। শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদের এই মাইনাস মানে হলো, এই কোম্পানিগুলোর দায় সম্পদের চেয়েও বেশি। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে এই শেয়ারগুলোর কোনো মূল্যই নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এই তিনটি প্রতিষ্ঠানসহ মোট চারটি এনবিএফআইকে অবসায়নের আওতায় এনেছে। অন্য প্রতিষ্ঠানটি হলো অভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেড। এই চারটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ ছিল তাদের মূলধনের ঘাটতি, খেলাপি ঋণের ভয়াবহ হার, তারল্য সংকট, আয়ে তীব্র পতন এবং আমানতকারীদের কাছে দায় পরিশোধে সম্পূর্ণ অক্ষমতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের (অভিভা, ফারইস্ট, এফএএস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও পিপলস লিজিং) খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯৩ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশ। এগুলোর কাছে আমানত ছিল ১৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ছিল খুচরা আমানতকারীদের। আমানতকারীদের সুরক্ষায় প্রতিজনকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কী হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। যারা পুঁজিবাজার থেকে এই কোম্পানিগুলোর শেয়ার কিনেছিলেন, তারা যদি কোনো ক্ষতিপূরণ না পান, তাহলে তাদের সব বিনিয়োগই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা কোম্পানিটির পরিচালনা বা ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্তে কোনো ভূমিকা রাখেননি। তাদের শাস্তি দেওয়ার কোনো কারণ নেই। এই যুক্তিতেই বিএসইসি হস্তক্ষেপ করেছে। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের নতুন আর্থিক রেজল্যুশন কাঠামোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই কাঠামোতে আমানতকারী, পাওনাদার, শেয়ারহোল্ডার সবার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশ ব্যাংক বিএসইসির এই প্রস্তাবে কী সাড়া দেয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় তারা কী পদক্ষেপ নেয়, সেটাই এখন এই ঘটনার সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষণের বিষয়।

