দেশের প্রধান পুঁজিবাজারে গত সপ্তাহজুড়ে বিরাজ করেছে নিম্নমুখী প্রবণতা। বিনিয়োগকারীদের সতর্ক মনোভাব ও জ্বালানি সংকট নিয়ে উদ্বেগের কারণে সপ্তাহ শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক আড়াই শতাংশের বেশি কমে গেছে, আর প্রায় সব খাতের শেয়ারেই দেখা গেছে নেতিবাচক প্রবণতা।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে প্রধান সূচক একশ সাতচল্লিশ পয়েন্ট কমে পাঁচ হাজার পাঁচশ পনেরো পয়েন্টে নেমে এসেছে, যেখানে তার আগের সপ্তাহে এই সূচক ছিল পাঁচ হাজার ছয়শ বাষট্টি পয়েন্টে। নির্বাচিত ভালো কোম্পানিগুলোর সূচকও পঁয়তাল্লিশ পয়েন্ট কমে দুই হাজার পঁচানব্বই পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক সূচকেও পতন হয়েছে তেত্রিশ পয়েন্টের, যা নেমে এসেছে এগারোশ পাঁচ পয়েন্টে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশের চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং এর ফলে শিল্প উৎপাদন ও করপোরেট মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থেকেই মূলত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিক্রির প্রবণতা বেড়ে যায়। সপ্তাহের শুরু থেকেই বাজারে বিক্রয়চাপ ক্রয়চাপকে ছাড়িয়ে যায়, ফলে টানা মন্দাভাব বিরাজ করে। একপর্যায়ে দিনের লেনদেনে সূচক পাঁচ হাজার পাঁচশ পয়েন্টের নিচেও নেমে যায়, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আরও উদ্বেগ ছড়িয়ে দেয়।
সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে মোট তিনশ ছিয়াশিটি কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট বন্ডের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ষাটটির শেয়ারদর বেড়েছে, বিপরীতে তিনশ দশটির দর কমেছে এবং ষোলোটির দরে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এ ছাড়া পঁচিশটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে কোনো লেনদেনই হয়নি। সূচক পতনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে কয়েকটি বড় মূলধনী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, যার মধ্যে রয়েছে ওষুধ, ব্যাংকিং ও বস্ত্র খাতের কয়েকটি পরিচিত নাম।
খাতভিত্তিক লেনদেনের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত সপ্তাহে মোট লেনদেনের প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ শতাংশ দখলে রেখে শীর্ষে ছিল বস্ত্র খাত। এরপরের অবস্থানে ছিল সাধারণ বীমা খাত, যার দখলে ছিল প্রায় সাড়ে চৌদ্দ শতাংশ লেনদেন। ওষুধ ও রসায়ন খাত ছিল তৃতীয় স্থানে, প্রায় সাড়ে দশ শতাংশ লেনদেন নিয়ে। এরপর যথাক্রমে ব্যাংক খাত প্রায় আট শতাংশ এবং প্রকৌশল খাত প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাংশ লেনদেন নিয়ে চতুর্থ ও পঞ্চম স্থান দখল করেছে।
তবে লেনদেনে এগিয়ে থাকলেও মুনাফার দিক থেকে প্রায় প্রতিটি খাতই ছিল নেতিবাচক ধারায়। শুধুমাত্র মিউচুয়াল ফান্ড ছাড়া বাকি সব খাতের শেয়ারেই সপ্তাহ শেষে লোকসান গুনতে হয়েছে বিনিয়োগকারীদের। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে সিরামিক খাত, যেখানে রিটার্ন কমেছে প্রায় ছয় শতাংশের কাছাকাছি। এ ছাড়া কাগজ খাতে সাড়ে পাঁচ শতাংশ, জীবন বীমা খাতে পাঁচ শতাংশ এবং সিমেন্ট খাতে প্রায় পৌনে পাঁচ শতাংশ নেতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জেও একই ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এই বাজারের সার্বিক সূচক দুই শতাংশ কমে চৌদ্দ হাজার আটশ সাতষট্টি পয়েন্টে নেমে এসেছে, যেখানে আগের সপ্তাহে এই সূচক ছিল পনেরো হাজার একশ তিয়াত্তর পয়েন্টে। অন্য একটি প্রধান সূচকও একই হারে কমে নয় হাজার তিয়াত্তর পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
সপ্তাহজুড়ে এই বাজারে প্রায় একশ চুয়ান্ন কোটি টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। মোট তিনশ সাতটি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে মাত্র আটান্নটির দর বেড়েছে, বিপরীতে দুইশ সাতাশটির দর কমেছে এবং বাইশটির দরে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুই পুঁজিবাজারেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে জ্বালানি খাতের সংকটকে কেন্দ্র করে। শিল্প উৎপাদনে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে করপোরেট মুনাফায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা আগামী দিনগুলোতেও বাজারের গতিপ্রকৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই সতর্ক মনোভাব অব্যাহত থাকতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

