পুঁজিবাজারে পাঁচটি ব্রোকারেজ হাউজের ব্যর্থতায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য সুখবর দিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল। যাদের পাওনার পরিমাণ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত, তাদের সম্পূর্ণ অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তহবিলটি, আর এই প্রক্রিয়া শুরু হবে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত মোট প্রায় ১৮ হাজার বিনিয়োগকারীর মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশই তাদের পুরো পাওনা ফেরত পাবেন।
যে পাঁচটি ব্রোকারেজ হাউজের গ্রাহকরা এই ক্ষতির শিকার হয়েছেন, সেগুলো হলো মশিউর সিকিউরিটিজ, তামহা সিকিউরিটিজ, বানকো সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ ও সালতা সিকিউরিটিজ।
মঙ্গলবার রাজধানীর নিকুঞ্জে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোমিনুল ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে সূচনা বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আর বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলের চেয়ারম্যানও বক্তব্য রাখেন অনুষ্ঠানে।
চেয়ারম্যান জানান, পাঁচটি ব্রোকারেজ হাউজে মোট প্রায় সাড়ে সতেরো হাজার বিনিয়োগকারী বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় আছেন। এর মধ্যে ইতিমধ্যেই তহবিল থেকে প্রায় সাড়ে সাঁইত্রিশ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হয়েছে। এখন পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পাওনাদারদের পুরো অর্থ একসঙ্গে ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, আর পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সর্বোচ্চ দুই মাস সময় লাগতে পারে বলে তিনি জানান।
বাকি প্রায় ৬০০ জন বিনিয়োগকারীর পাওনা আদায়ে সংশ্লিষ্ট খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার বিক্রি এবং পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করে হলেও পাওনা আদায়ের চেষ্টা করা হবে। তিনি এই উদ্যোগকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াদের মধ্যে রয়েছেন অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, বিচারক ও ব্যাংক কর্মকর্তা, যাঁদের মধ্যে কেউ কেউ শারীরিকভাবে অসুস্থ, আবার কারও পরিবারে জরুরি আর্থিক প্রয়োজন রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তাঁদের অর্থ ফিরিয়ে দেওয়াকে একটি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেই দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
তহবিলের অর্থের উৎস প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান জানান, ব্রোকারেজ হাউজগুলোর লেনদেন কমিশনের একটি অংশ থেকে প্রতি ছয় মাস অন্তর এই তহবিলে অর্থ জমা হয়, পাশাপাশি জমাকৃত অর্থের সুদ থেকেও তহবিল সমৃদ্ধ হয়। তিনি জানান, গত বছর নেওয়া এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্রোকারেজ হাউজগুলো তাদের অর্জিত সুদের একটি নির্দিষ্ট অংশ এই তহবিলে জমা দিয়েছে, আর এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা-বিতর্ক থাকলেও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে এই অর্থ ব্যবহারে সমর্থন জানিয়েছে।
চেয়ারম্যান আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের তথ্য ইতিমধ্যে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে এবং খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে—এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালতে পৃথক মামলাও চলছে।
গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের বিভিন্ন অনিয়ম গণমাধ্যমে তুলে ধরার কারণেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে নজরদারি আরও জোরদার করা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাংবাদিকদের নিয়মিত অবহিত রাখতে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

