পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা নতুন ও মানসম্মত কোম্পানির তালিকাভুক্তির সংকট কাটাতে বড় পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে অন্তত ১০টি ব্লু-চিপ কোম্পানিকে বাজারে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি, যেগুলো সরাসরি তালিকাভুক্তি বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে বাজারে প্রবেশ করবে।
মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে এই লক্ষ্যের কথা জানান ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি ও দেশীয় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর ভাষ্যে, গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে বাজারে কোনো উল্লেখযোগ্য আইপিও বা নতুন তালিকাভুক্তি হয়নি, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতেই সরাসরি তালিকাভুক্তির নতুন বিধিমালা এবং আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন সম্প্রতি একটি খসড়া বিধিমালা জনমতের জন্য প্রকাশ করেছে। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার মূল বিষয় হলো—কোনো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির নতুন করে মূলধন সংগ্রহের প্রয়োজন না থাকলেও, বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার বিক্রির মাধ্যমেই তারা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে। ডিএসই চেয়ারম্যানের মতে, এই নতুন নিয়ম কার্যকর হলে বড় ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর বাজারে আসার পথ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে, সঙ্গে থাকবে দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের সুবিধাও।
নতুন কোম্পানির ক্ষেত্রে আইপিও প্রক্রিয়াও সহজ করার কাজ চলছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্যে, সংশোধিত আইপিও বিধিমালা আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই জনমতের জন্য প্রকাশ করা হতে পারে। পাশাপাশি আইপিও ও সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা যথাযথভাবে প্রয়োগের জন্য ডিএসইর নিজস্ব সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে।
বড় কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ডিএসই চেয়ারম্যান জানান, ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান সরাসরি তালিকাভুক্তি বা আইপিওর জন্য আবেদন করলে তাদের তালিকাভুক্তি ফি অর্ধেক মওকুফ করা হবে। এ ছাড়া বন্ড তালিকাভুক্তির ফিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে এই লক্ষ্য পূরণে একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন ডিএসই চেয়ারম্যান। তাঁর মতে, সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। তিনি জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থাও বড় ও ভালো কোম্পানিগুলোকে দ্রুত পুঁজিবাজারে আনার বিষয়ে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি সভরেন বন্ডের মাধ্যমে বাজারের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্যে, সরকার ইতিমধ্যে সভরেন বন্ড ইস্যুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে, আর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোকে দেশের বাজারে নিয়ে আসা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে করপোরেট বন্ড ইস্যুর পথও সহজ হবে। তিনি মনে করেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে সভরেন বন্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও তুলে ধরেন ডিএসই চেয়ারম্যান। তিনি জানান, পাঁচটি খেলাপি ব্রোকারেজ হাউজের ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় আঠারো হাজার বিনিয়োগকারীর মধ্যে যাদের পাওনা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত, তাদের সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে, যাতে প্রায় ৯৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী তাদের পুরো পাওনা ফিরে পাবেন।
সবশেষে তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে নতুন মানসম্মত কোম্পানি আনার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ, আর এই দুই উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলেই বাজারের স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি গতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব হবে।

