অর্থনীতিতে নানা ধরনের চাপ, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং নীতিসুদ অপরিবর্তিত রাখার পরও দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বেড়েছে। গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গড় দৈনিক লেনদেন আগের সপ্তাহের তুলনায় ৪২ শতাংশ বেড়ে ৭৮৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সপ্তাহজুড়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪৬ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৫৭৮ পয়েন্টে অবস্থান করে। একই সময়ে বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারের সূচক ডিএস৩০ ১০ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১১২ পয়েন্টে পৌঁছেছে।
বাজারে লেনদেন হওয়া শেয়ার ও ইউনিটের মধ্যে ২৫২টির দর বেড়েছে। বিপরীতে ১০৫টির দর কমেছে এবং ২৯টি অপরিবর্তিত ছিল। তবে সপ্তাহ শেষে ডিএসইর মোট বাজার মূলধন প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা কমেছে।
সাপ্তাহিক বাজার পর্যালোচনায় সেলটেক ব্রোকারেজ লিমিটেড জানিয়েছে, গত সপ্তাহে বাজারে একদিকে বাছাই করা কম দামের শেয়ারে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখা গেছে, অন্যদিকে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতাও ছিল। ফলে পুরো সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মিশ্র মনোভাব কাজ করেছে।
সপ্তাহের শুরুতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীল করার বিষয়ে মুডিসের সিদ্ধান্ত এবং জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির খবরে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। জুনে হিসাব বছর শেষ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য আয় ও লভ্যাংশ ঘোষণার প্রত্যাশাও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ায়।
তবে সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব বাজারে পড়ে। সপ্তাহের শেষদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিসুদ অপরিবর্তিত রাখায় বিনিয়োগকারীদের একাংশ হতাশ হন। বাজারে নীতিসুদ কমার প্রত্যাশা থাকলেও তা না হওয়ায় লেনদেনের পরিবেশ কিছুটা চাপের মুখে পড়ে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে যে নতুন করে কেনাকাটার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, সেটি অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ে কি না, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রস্তাবিত বাজার উন্নয়ন উদ্যোগের অগ্রগতি, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং জুনে হিসাব বছর শেষ হওয়া কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফলও সামনে বাজারের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
সপ্তাহে ডিএসইএক্স সূচকের উত্থানে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ছিল স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ওরিয়ন ফার্মা, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, ওরিয়ন ইনফিউশন ও ইউনিক হোটেল।
খাতভিত্তিক লেনদেনে সবচেয়ে বেশি অংশ ছিল বস্ত্র খাতের, যা মোট লেনদেনের ২০ দশমিক ৫০ শতাংশ। এরপর ছিল বিমা খাত ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ, ওষুধ ও রসায়ন ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ, মিউচুয়াল ফান্ড ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ব্যাংক খাত ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ।
সাপ্তাহিক দর বৃদ্ধির হিসাবে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল মিউচুয়াল ফান্ড খাত। এ খাতের সূচক ৬ দশমিক ১২ শতাংশ বেড়েছে। এরপর কাগজ ও মুদ্রণ খাত ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ, সাধারণ বিমা ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং জীবন বিমা ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে প্রকৌশল খাতের সূচক শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাত শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশ এবং ব্যাংক খাত শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ কমেছে।
সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া শেয়ারের তালিকায় ছিল ইস্টার্ন ব্যাংক, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, আইপিডিসি ফাইন্যান্স ও সাইহাম টেক্সটাইল।
দর বৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে ছিল ফার্স্ট প্রাইম ফাইন্যান্স মিউচুয়াল ফান্ড। সপ্তাহে এর দর ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এরপর আইসিবি এএমসিএল সেকেন্ড মিউচুয়াল ফান্ড ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স ৩০ দশমিক ৪৬ শতাংশ, ওরিয়ন ইনফিউশন ২৩ দশমিক ০২ শতাংশ এবং ওরিয়ন ফার্মা ১৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে সাপ্তাহিক দরপতনের তালিকায় শীর্ষে ছিল ওয়ালটন। কোম্পানিটির শেয়ারের দর ১২ দশমিক ৯৫ শতাংশ কমেছে। এ ছাড়া অ্যানলিমা ইয়ার্ন, এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, বে লিজিং ও আল-হাজ টেক্সটাইলের দর ৬ দশমিক ৪০ থেকে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও গত সপ্তাহে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। নির্বাচিত কোম্পানির সূচক সিএসসিএক্স ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেড়ে ৯ হাজার ১৪৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আর সার্বিক সূচক ক্যাসপি ১ দশমিক ১৯ শতাংশ বেড়ে ১৪ হাজার ৯১২ পয়েন্টে অবস্থান করেছে।

