সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের পতন দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। সোমবার সকালে লেনদেন শুরুর দিকে সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বিক্রির একধরনের প্রচ্ছন্ন চাপ তৈরি হয়। মূলত সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি এবং উৎপাদন খরচ বাড়ার শঙ্কা নিয়ে বাজারে একধরনের সতর্ক অবস্থা বিরাজ করছে। এর ফলে যেসব বিনিয়োগকারী আগে কমে যাওয়া শেয়ার কিনেছিলেন তারা কিছুটা মুনাফা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। যে কারণে দিনশেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৬ দশমিক ৮৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫২৫ পয়েন্টে এসে দাঁড়িয়েছে। সূচক ও বাজার মূলধন কমে যাওয়ার এই ঘটনা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় একটি সতর্কবার্তা।
শেয়ারবাজারের সাধারণ অর্থনৈতিক তত্ত্ব বা থিওরি বলে যখন কোনো বাজারে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সংকট থাকে তখন ছোটখাটো মুনাফা পেলেই বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে দেন। যাকে ফাইন্যান্সের ভাষায় বলা হয় প্রফিট বুকিং বা মুনাফা তুলে নেওয়া। সোমবারের বাজারে ঠিক এই চিত্রটিই দেখা গেছে। সকালের দিকে কিছু ব্লু চিপ শেয়ারের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ থাকলেও দুপুরের পর সেই চিত্র বদলাতে শুরু করে। একদিকে কোম্পানির উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কা এবং অন্যদিকে আগামী দিনগুলোর অর্থনৈতিক নীতিমালার অস্পষ্টতা বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে দূরে রাখছে। এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে লেনদেনের মনস্তাত্ত্বিক দিকের ওপর। যার কারণে ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতার পাল্লাই দিনশেষে বেশি ভারী ছিল।
কেন ক্রেতা হারাচ্ছে অধিকাংশ শেয়ার
দিনের লেনদেনের সার্বিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বাজারের এই নেতিবাচক প্রবণতার বিষয়টি আরও বেশি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এদিন ডিএসইতে মোট লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। মোট লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২২৪টি কোম্পানির শেয়ারের দাম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এর বিপরীতে দাম বেড়েছে মাত্র ১২৫টি কোম্পানির শেয়ারের এবং অপরিবর্তিত ছিল বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের দর। এই পরিসংখ্যান থেকে এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে নির্দিষ্ট কিছু খাত ছাড়া বেশিরভাগ শেয়ার থেকেই বিনিয়োগকারীরা নিজেদের পুঁজি সরিয়ে নিচ্ছেন।
বাজারের অন্যান্য সূচকগুলোর অবস্থাও ছিল প্রায় একই রকম হতাশাজনক। শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানিগুলোর সূচক বা ডিএসইএস দিনশেষে ৩ দশমিক ১১ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১০০ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে বাজারের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো নিয়ে গঠিত ডিএস থার্টি সূচকটিও পতন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি। এই সূচকটি ১ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৯৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। সূচকগুলোর এই ধারাবাহিক পতন প্রমাণ করে যে ছোট বা দুর্বল কোম্পানির পাশাপাশি বড় ও আর্থিকভাবে সবল কোম্পানিগুলোর শেয়ারও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখতে পারছে না।
হতাশার ভিড়ে টার্নওভারের হিসাব
তবে সূচক ও অধিকাংশ শেয়ারের দরপতন হলেও সার্বিক লেনদেনের পরিমাণ একেবারে হতাশাজনক ছিল না। এদিন ডিএসইতে মোট ৭৪৬ কোটি ৪৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিট হাতবদল হয়েছে। পুরো কার্যদিবস জুড়ে মোট ১ লাখ ৯৫ হাজার ৬৯৯টি আলাদা ট্রেড সম্পন্ন হয়েছে। যার মাধ্যমে হাতবদল হয়েছে ২৩ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার ৪৫৯টি শেয়ার ও ইউনিট। এই পরিমাণ টার্নওভার প্রমাণ করে যে বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতার অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু বিক্রির চাপ বেশি থাকায় সেই অংশগ্রহণ শেষ পর্যন্ত সূচককে টেনে ওপরে তুলতে পারেনি।
পতন ও হতাশার এই দিনে দেশের প্রধান পুঁজিবাজারের মূলধনেও বড় রকমের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দিনশেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মোট বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৫৩৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। বাজার মূলধন কমে যাওয়া মানেই হলো সামগ্রিকভাবে বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক মূল্যায়ন কমে যাওয়া। সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সবার জন্যই এটি একটি চিন্তার বিষয়। সামষ্টিক অর্থনীতির মূল সংকটগুলো কাটানো না গেলে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর মতো সুনির্দিষ্ট কোনো পলিসি গ্রহণ করা না হলে বাজারের এই অস্থিরতা কতদিন চলবে তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

