পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অর্থ সুরক্ষা এবং ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ঠেকাতে সব ব্রোকারেজ হাউসে একটি অভিন্ন ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবস্থা চালুর ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, এমন একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্রোকারদের ব্যাংক হিসাব এবং গ্রাহক সমন্বিত হিসাবের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পারবে। এতে প্রতিদিন অর্থের মিল যাচাই করা সম্ভব হবে এবং কোনো ঘাটতি বা অনিয়ম শুরুতেই শনাক্ত করা যাবে।
তিনি বলেন, বর্তমান ডিজিটাল যুগে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এর বিকল্প নেই।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা তহবিল থেকে পাঁচটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়।
বর্তমানে দেশের ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা আলাদা ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষে সব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক তথ্য একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়।
প্রস্তাবিত একক সফটওয়্যার ব্যবস্থায় ব্রোকারদের ব্যাংক হিসাব ও গ্রাহক সমন্বিত হিসাবের অর্থ যাচাই, তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং অনিয়ম শনাক্ত করার সুযোগ থাকবে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, ডিএসইর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি লেনদেন ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও কাজ করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি কয়েকটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পাঁচটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান—মশিহুর সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ, শাহ মোহাম্মদ সগীর অ্যান্ড কোং, তামহা সিকিউরিটিজ এবং ব্যাংকো সিকিউরিটিজ—মিলে প্রায় ৪৯২ কোটি টাকার অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১৭ হাজার ৯৬৭ জন বিনিয়োগকারী।
ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল থেকে অর্থ ফেরতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রথম ধাপে মশিহুর সিকিউরিটিজের ১৫ জন ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীকে মোট ৭৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রতিজন সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পেয়েছেন।
এই প্রতিষ্ঠানের ৯ হাজার ৩৮৬ জন ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীকে পর্যায়ক্রমে ৪২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হবে। অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানের যাচাইকৃত দাবিও ধাপে ধাপে নিষ্পত্তি করা হবে।
ডিএসই জানিয়েছে, পাঁচটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের জন্য মোট ৭২ কোটি টাকা বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল থেকে দেওয়া হবে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, যেসব বিনিয়োগকারীর দাবি ৫ লাখ টাকার কম, তারা প্রথম ধাপে পুরো অর্থ ফেরত পাবেন। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৯৬ শতাংশের দাবি এই সীমার মধ্যে রয়েছে।
পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
ডিএসই চেয়ারম্যান মোমিনুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারে লাভ-ক্ষতি স্বাভাবিক বিষয়। তবে কোনো মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের কারণে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা বাজারের প্রতি আস্থা নষ্ট করে।
তিনি বলেন, পাঁচটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি। বিভিন্ন উপায়ে বিনিয়োগকারীদের অর্থ বা শেয়ার নিজেদের হিসাবে স্থানান্তর করা হলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি।
বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল মূলত ব্রোকারদের অবদান, লেনদেন কমিশন এবং গ্রাহক হিসাবের জমার সুদ থেকে অর্থ পায়।
ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও স্বার্থ রক্ষা একটি স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের অন্যতম ভিত্তি।
বিএসইসির কর্মকর্তারা জানান, অতীতের অনিয়ম শুধু সমাধান করলেই হবে না, ভবিষ্যতে যেন একই ধরনের ঘটনা না ঘটে সে জন্য কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অর্থ ফেরত নয়, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

