বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সরাসরি ঋণ তুলতে প্রথমবারের মতো সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। আগামী তিন মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ডিসেম্বরের মধ্যে এই বন্ড বাজারে আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ৫০ কোটি ডলার তোলার পরিকল্পনা থাকলেও বাজার অনুকূল থাকলে অঙ্কটি ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত যেতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১০০ কোটি ডলার প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সমান।
সার্বভৌম বন্ড হলো কোনো দেশের সরকারের ছাড়া ঋণপত্র। এটি কিনে বিনিয়োগকারীরা সরকারকে টাকা ধার দেন। বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর সুদ পান এবং মেয়াদ শেষে আসল ফেরত পান। এত দিন বাংলাদেশ বিদেশি ঋণ নিয়েছে মূলত বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা ও আইএমএফের মতো উন্নয়ন সহযোগী এবং কিছু দ্বিপক্ষীয় উৎস থেকে। এবার সরকার সরাসরি বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে যাচ্ছে।
বন্ড ইস্যুর ব্যবস্থাপক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের অন্যতম বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান জেপিমরগ্যান চেজ অ্যান্ড কোম্পানিকে নিয়োগের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল ইউরোপ ও নিউইয়র্কে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সেসব বৈঠকে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের আভাস মিলেছে।
সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য গত জুলাইয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কমিটির নেতৃত্বে আছেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি। কমিটি একাধিক বৈঠক করেছে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১৫টি বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্যে আছে ব্ল্যাকরক, প্যাসিফিক ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (পিমকো), টেক্সাস প্যাসিফিক গ্রুপ (টিপিজি), ম্যাকোয়ারি, গোল্ডেন ট্রি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ও মেটলাইফ। তানভীর শাহরিয়ার গনির মতে, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ অত্যন্ত বেশি। তবে বন্ডের কাঠামো, সুদের হার ও আইনি বিষয় চূড়ান্ত করার আগে আরও আলোচনা দরকার বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণের খরচ বাড়ার বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। কত সুদ দিতে হবে, তা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত হবে।
এই উদ্যোগের পেছনের কারণ বোঝা কঠিন নয়। বৈশ্বিক সুদের হার বাড়ায় উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের শর্ত ও ব্যয় আগের চেয়ে বদলেছে। একই সময়ে দেশের উন্নয়ন ব্যয়, বিদেশি ঋণ পরিশোধ এবং ডলারের চাহিদা বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার। এর বড় অংশ ঘাটতি অর্থায়নে মেটাতে হবে। ফলে অর্থের উৎস বাড়ানো সরকারের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।
সংখ্যাটির আকার বাজেটের পাশে রাখলে ছবিটা পরিষ্কার হয়। ১০০ কোটি ডলার বা ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা মোট বাজেটের প্রায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ। ৫০ কোটি ডলার হলে তা আরও কম, প্রায় দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ এই বন্ড বাজেট ঘাটতি পূরণের প্রধান উপায় নয়। এর আসল তাৎপর্য অন্যত্র। ডলারে সরাসরি অর্থ পাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ঋণযোগ্যতার একটি দাম নির্ধারিত হওয়া, এ দুটিই এখানে মুখ্য।
প্রথম বন্ড সম্ভবত মার্কিন ডলারে ছাড়া হবে। কারণ ডলারভিত্তিক বন্ডের বাজার সবচেয়ে বড়, ফলে বিনিয়োগকারী পাওয়া তুলনামূলক সহজ। ভবিষ্যতের জন্য সরকার আরও কয়েকটি পথ যাচাই করছে। এর মধ্যে আছে জাপানি ইয়েনে সামুরাই বন্ড, চীনা ইউয়ানে পান্ডা বন্ড, হংকংয়ের ডিম সাম বন্ড এবং ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক সুকুক। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য, পান্ডা বন্ড নিয়ে চীনা এক্সিম ব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের আলোচনাও হয়েছে। বিভিন্ন মুদ্রা ও বাজারে যাওয়ার এই ভাবনা ঋণের উৎস ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে। একটি বাজারে সুদের হার চড়া হলে অন্যটির দিকে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সুদের হার। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দেশের ঋণমান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি দেখে সুদ ঠিক করেন। বাংলাদেশের ঋণমান এখনো তুলনামূলক নিচের স্তরে। সম্প্রতি মুডিজ দেশের ঋণমানের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীল করেছে, যা ইতিবাচক লক্ষণ। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস ও ফিচের মূল্যায়নে ঝুঁকির কথা এখনো রয়ে গেছে। তিন সংস্থার এই ভিন্ন সুর বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে। ফলে প্রথম বন্ডে বাংলাদেশকে বাড়তি ঝুঁকির দাম, অর্থাৎ বেশি সুদ দিতে হতে পারে। আর প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সুদে বন্ড ছাড়লে ভবিষ্যতে বিদেশি ঋণের বোঝা ভারী হবে, সংশ্লিষ্টরা এই আশঙ্কাও করছেন।
রিজার্ভের দিক থেকে কিছুটা স্বস্তির জায়গা আছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভে ইতিবাচক প্রবণতা এসেছে। তবু বিদেশি ঋণের কিস্তি, জ্বালানি ও পণ্য আমদানির খরচসহ নানা পরিশোধের চাপ রয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে ৫০ থেকে ১০০ কোটি ডলার নতুন করে হাতে এলে রিজার্ভে তাৎক্ষণিক সহায়তা মিলবে। কিন্তু এটি আয় নয়, ঋণ। ভবিষ্যতে আসলের সঙ্গে সুদও ফেরত দিতে হবে। রিজার্ভের সংখ্যা সাময়িকভাবে বাড়লেও দায় একই পরিমাণে বাড়বে, এই সরল সত্যটি মাথায় রাখা জরুরি।
অর্থ কোথায় খরচ হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হলে সেখান থেকে আয় তৈরি হয় এবং সেই আয় দিয়ে ঋণ শোধ করা যায়। অবকাঠামো, বন্দর ও রেল যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, ডিজিটাল কাঠামো এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর মতো খাতে আয়ের সম্ভাবনা বেশি। উল্টো দিকে, চলতি বা অনুৎপাদনশীল ব্যয় মেটাতে বিদেশি বন্ডের টাকা খরচ হলে ভবিষ্যতে ঋণের চাপ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ডলারে ঋণ নিয়ে টাকায় আয় করলে বিনিময় হারের ওঠানামাও ঝুঁকি বাড়ায়। কারণ ডলারের দাম বাড়লে একই ঋণ শোধ করতে বেশি টাকা লাগে।
সিপিডির গবেষক ও অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, বন্ডের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা জরুরি। তাঁর মতে, সরকারের পরিচালন ব্যয় বাড়তে থাকলে নতুন ঋণের টাকায় সেই ব্যয় মেটানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনাও একই সঙ্গে খতিয়ে দেখা দরকার।
এই বন্ড শুধু অর্থ জোগাড়ের মাধ্যম নয়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ঋণ নেওয়ার সামর্থ্যের একটি নতুন পরীক্ষাও। প্রথম ইস্যুতে কত ডলার এল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে কোন সুদে ও কোন শর্তে এল। সেই সুদের হার ভবিষ্যতের জন্য একটি মাপকাঠি হয়ে থাকবে। ভালো শর্তে সফল হলে পরে আরও বড় অঙ্কের অর্থ তোলার পথ সহজ হবে। আর চড়া সুদে ছাড়তে হলে সেটিই ভবিষ্যৎ ঋণের দর কষাকষিতে বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে নতুন কোনো বিদেশি ঋণ নেওয়ার আগে সরকারকে তিনটি হিসাব একসঙ্গে মেলাতে হবে। ঋণ শোধের সামর্থ্য, ডলারের বিনিময় হার এবং বন্ডের সুদের হার। এই তিনের ভারসাম্যের ওপরই নির্ভর করবে, প্রথম আন্তর্জাতিক বন্ড দেশের জন্য সুযোগ হয়ে উঠবে, নাকি নতুন বোঝা।

