পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়ন এবং সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফেরাতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ‘বিএসইসি করপোরেট সুশাসন বিধিমালা’ চূড়ান্তভাবে জারি করা হবে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার হোসেন সাদাত এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী ও অংশীজনদের মতামত বিবেচনায় নিয়ে বিধিমালাটি পরিমার্জন করা হবে।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানের হোটেল রেনেসাঁয় এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশে করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালীকরণ: প্রস্তাবিত বিএসইসি করপোরেট গভর্ন্যান্স বিধিমালা’ শীর্ষক এই আলোচনার আয়োজন করে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেড।
কমিশনার বলেন, পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়ন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের চেষ্টায় সম্ভব নয়। এর জন্য সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তাঁর ভাষ্য, বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং ভালো মানের নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করাই বিএসইসির মূল লক্ষ্য। এ জন্য নীতি প্রণয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সহায়ক পরিবেশ তৈরিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে আইপিও রুলস, মার্জিন রুলস এবং ডাইরেক্ট লিস্টিং নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফল হিসেবে আন্তর্জাতিক আর্থিক মূল্যায়ন সংস্থা জেপি মরগান আগামী নভেম্বর থেকে আবার বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে তাদের সূচকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কমিশনারের মতে, এটি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ও বিএসইসির মধ্যে নিয়মিত সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পার্টনার জারিন মাহমুদ হোসেন। সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক স্নেহাশিষ বড়ুয়া।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞেরা বলেন, শুধু কাগজে-কলমে নিয়ম মানার মাধ্যমে, অর্থাৎ ‘টিক-বক্স’ কমপ্লায়েন্সে, ভালো করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা যায় না। তাঁদের মতে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ যেন কেবল সম্মানী পাওয়ার জন্য নামকাওয়াস্তে না হয়। তাঁদের প্রকৃত মূল্যায়ন, দক্ষতা ও কৌশলগত ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। বক্তারা সম্পর্কিত পক্ষের লেনদেনে স্বচ্ছতা আনা এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ওপর জোর দেন। কোম্পানিগুলোর জন্য সাইবার সিকিউরিটি অডিট বাধ্যতামূলক করার তাগিদও দেন তাঁরা।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) অধ্যাপক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. মেলিতা মেহজাবীন, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশের (আইসিএসবি) কাউন্সিল সদস্য এম নুরুল আলম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ এ মামুন, আইএফসির করপোরেট গভর্ন্যান্স অ্যাডভাইজরি লিড লোপা রহমান এবং বিশ্বব্যাংকের লিড গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট সুরাইয়া জান্নাত। এ ছাড়া ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের সভাপতি মুনির হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিবসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা ছিলেন।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব কয়েকটি দিক থেকে স্পষ্ট। প্রথমত, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকটে ভুগছে। বিনিয়োগকারীদের বড় অভিযোগ, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। তাই শক্তিশালী সুশাসন কাঠামো আস্থা ফেরানোর অন্যতম পূর্বশর্ত।
দ্বিতীয়ত, বিশেষজ্ঞদের ‘টিক-বক্স’ প্রসঙ্গটি বিধিমালার মূল চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে। নিয়ম যতই কঠোর হোক, বাস্তবায়নে আন্তরিকতা না থাকলে তা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে স্বাধীন পরিচালকের ভূমিকা কার্যকর করা না গেলে পর্ষদের ওপর নজরদারির উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
তৃতীয়ত, সম্পর্কিত পক্ষের লেনদেন অনেক ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাতের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। এতে স্বচ্ছতা না এলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। সাইবার নিরাপত্তা অডিটের দাবিও সময়োপযোগী, কারণ ডিজিটাল লেনদেনের যুগে তথ্য সুরক্ষা এখন সুশাসনেরই অংশ।
চতুর্থত, জেপি মরগানের সূচকে ফেরার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক সংকেত হলেও বিদেশি বিনিয়োগ টানতে তা যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীরা শেষ পর্যন্ত দেখবেন নিয়ম কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে। ফলে ডিসেম্বরের মধ্যে বিধিমালা জারির সময়সীমা রক্ষা করা এবং তা বাস্তবায়নে দৃঢ় তদারকি নিশ্চিত করাই হবে বিএসইসির প্রকৃত পরীক্ষা।
সব মিলিয়ে অংশীজনদের মতামত নিয়ে বিধিমালা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে সেই মতামত কতটা প্রতিফলিত হয় এবং জারির পর প্রয়োগ কতটা কঠোর হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরার গতি।

