টানা চার কার্যদিবস পতনের পর বুধবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার দেখা মিললেও সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর দেশের শেয়ারবাজারে আবার দরপতন হয়েছে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সবক’টি মূল্যসূচক কমেছে।
তবে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচক বেড়েছে। ডিএসইতে সূচক কমলেও লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা ও বাজারে অস্থিরতা, দুটিরই ইঙ্গিত দেয়। দিনের শুরুতে ঊর্ধ্বমুখী থাকা বাজার প্রথম ঘণ্টার পর উল্টো দিকে ঘুরে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটও স্পষ্ট হয়েছে।
ডিএসইতে এদিন লেনদেন শুরু হয় বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার মাধ্যমে, ফলে শুরুতে সূচকও ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তবে প্রথম ঘণ্টার লেনদেন শেষ হওয়ার পরই বাজারের চিত্র বদলে যায়। দাম বাড়ার তালিকা থেকে একের পর এক কোম্পানি দাম কমার তালিকায় চলে যেতে থাকে এবং লেনদেনের শেষ পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকে। এর ফলে সব মূল্যসূচক কমেই দিনের লেনদেন শেষ হয়। শুরুর উচ্ছ্বাস দ্রুত মিলিয়ে যাওয়া দেখায়, বিনিয়োগকারীরা দাম বাড়লেই শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নিচ্ছেন, অথবা বাজারে ক্রেতার চাপ টেকসই হচ্ছে না। এর কারণ প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
দিন শেষে ডিএসইতে ৮৫টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, কমেছে ২৪২টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৫৮টির। অর্থাৎ দাম বাড়া প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কমা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ। এই ব্যবধান পতনের ব্যাপকতা স্পষ্ট করে, কারণ একদিনে লেনদেন হওয়া কোম্পানির প্রায় ৬২ শতাংশেরই দাম কমেছে।
খাতভিত্তিক বিভাজনে দেখা যায়, পতনের চাপ প্রায় সব শ্রেণিতেই ছিল। ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া ভালো কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৩২টির দাম বেড়েছে, কমেছে ১৪১টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ২১টির। ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া মাঝারি মানের কোম্পানির মধ্যে ২০টির দাম বেড়েছে, কমেছে ৪৯টির এবং অপরিবর্তিত ৪টির। লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে জেড গ্রুপে থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৩৩টির দাম বেড়েছে, কমেছে ৫২টির এবং অপরিবর্তিত ৩৩টির।
এ ছাড়া একটি মিউচুয়াল ফান্ডের দাম বেড়েছে, কমেছে ২৩টির এবং অপরিবর্তিত ৯টির। এখানে লক্ষণীয়, ভালো কোম্পানির শ্রেণিতেই দাম কমার হার সবচেয়ে বেশি, ১৯৪টির মধ্যে ১৪১টি, যা প্রায় ৭৩ শতাংশ। সাধারণত মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারকে নিরাপদ মনে করা হলেও পতনে সেগুলোও রেহাই পায়নি। আর বিপরীতে জেড গ্রুপের দুর্বল কোম্পানির ৩৩টির দাম বাড়া ইঙ্গিত দেয়, স্বল্পমেয়াদি ফটকা কেনাবেচাও বাজারে সক্রিয়। মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে ২৩টির দাম কমায় ফান্ডের ইউনিটধারীরাও চাপে।
দাম কমার তালিকা বড় হওয়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ১৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫৩১ পয়েন্টে নেমেছে। বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৪ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১০৩ পয়েন্টে এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১০০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। পতনের হার হিসাব করলে ডিএসইএক্স কমেছে প্রায় ০.৩ শতাংশ, ডিএসই-৩০ প্রায় ০.২ শতাংশ এবং শরিয়াহ সূচক প্রায় ০.২ শতাংশ। দিনের শুরুর ঊর্ধ্বগতি হারালেও পতনের মাত্রা তুলনামূলক মৃদু। সূচকের এই সামান্য পতন বড় ধসের ইঙ্গিত নয়। তবে টানা পতন ও সামান্য ঊর্ধ্বগতির পুনরাবৃত্তি বাজারে দিকনির্দেশনার অভাব দেখায়।
সূচক কমলেও ডিএসইতে লেনদেন বেড়েছে। আজ লেনদেন হয়েছে ৭২৩ কোটি ১১ লাখ টাকা, আগের কার্যদিবসে ছিল ৬৯৯ কোটি ১১ লাখ টাকা। অর্থাৎ লেনদেন বেড়েছে ২৪ কোটি টাকা, যা প্রায় ৩.৪ শতাংশ। সূচক নামার সঙ্গে লেনদেন বাড়া অনেক সময় ইঙ্গিত দেয়, বিনিয়োগকারীরা দাম কমার মধ্যেও বিক্রি বা কেনাবেচা চালিয়ে যাচ্ছেন, হয়তো আতঙ্কে বিক্রি বা সস্তায় কেনার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। কোনটি ঘটছে, তা প্রতিবেদনে বলা হয়নি এবং এর জন্য আলাদা বিশ্লেষণ দরকার।
লেনদেনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আইপিডিসি ফাইন্যান্স, কোম্পানিটির ৫০ কোটি ৯৯ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। এরপরের স্থানে মালেক স্পিনিং, ৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা এবং তৃতীয় স্থানে প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, ২৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা। শীর্ষ দশের বাকি সাত কোম্পানি হলো সায়হাম টেক্সটাইল, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, সায়হাম কটন, ইভিন্স টেক্সটাইল, এনভয় টেক্সটাইল ও আর্গন ডেনিমস। শীর্ষ দশের মধ্যে আটটিই টেক্সটাইল ও বস্ত্রসংশ্লিষ্ট কোম্পানি, যা দেখায় সেই খাতের শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এ দিন বেশি ছিল। কেন এই খাতে আগ্রহ, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
অন্য শেয়ারবাজার সিএসইতে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৮৮টি কোম্পানির মধ্যে ৭১টির দাম বেড়েছে, কমেছে ৮৪টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৩৩টির। দাম কমা কোম্পানি বেশি হওয়ার পরও সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৭ পয়েন্ট বেড়েছে। এই ব্যবধান অস্বাভাবিক। সাধারণত বেশির ভাগ শেয়ারের দাম কমলে সূচকও কমে। সূচক বাড়া বোঝায়, বাজারমূল্যের বিচারে ভারী কিছু কোম্পানির দাম এত বেড়েছে যে বাকিদের পতন পুষিয়ে দিয়েছে।
কোন কোম্পানির কারণে এমন হলো, তা প্রতিবেদনে বলা নেই। আর সিএসইতে লেনদেন হয়েছে মাত্র ১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, আগের কার্যদিবসের ৪৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকার চেয়ে প্রায় ৬৬ শতাংশ কম। অর্থাৎ ডিএসইর বিপরীতে সিএসইতে সূচক বাড়লেও লেনদেনের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, ফলে সূচকের এই ঊর্ধ্বগতি কতটা টেকসই, সে প্রশ্ন থেকে যায়।
সব মিলিয়ে সপ্তাহের শেষ দিনে ডিএসইর বাজার ছিল পতনমুখী এবং দিনের শুরুর ইতিবাচক প্রবণতা টেকেনি। তবে সূচকের পতন সামান্য এবং লেনদেন বেড়েছে, যা বাজারে সক্রিয়তা বজায় থাকার ইঙ্গিত। পতনের কারণ নিয়ে প্রতিবেদনে কোনো বিশ্লেষক বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার মন্তব্য নেই। ফলে এই ওঠানামার পেছনে সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি, রাজনৈতিক বা নীতিগত কারণ আছে কি না, তা বলা যায় না। বিনিয়োগকারীদের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বল্পমেয়াদি ওঠানামায় আতঙ্কিত না হয়ে কোম্পানির মৌলভিত্তি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া। নতুন সপ্তাহের লেনদেনে বাজার টানা পতনের ধারা ভাঙতে পারে কি না, এবং ডিএসইর সূচক ৫ হাজার ৫০০ পয়েন্টের কাছাকাছি স্থির থাকে কি না, সেদিকে নজর থাকবে।

