দেশের শিল্পায়ন ও পুঁজিবাজার উন্নয়নে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা আইসিবি বর্তমানে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ঋণের চাপ, লোকসান এবং বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর মূল্যহ্রাস কাটিয়ে উঠতে প্রতিষ্ঠানটি একটি বহুপর্যায়ের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করেছে।
প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্তির দিনে আইসিবি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনা প্রকাশ করতে যাচ্ছে। অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
এক সময়ের লাভজনক ও সরকারের রাজস্বে অবদান রাখা এই রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিনের পুঁজিবাজার অস্থিরতার কারণে আর্থিক চাপের মুখে পড়ে। শেয়ারবাজার থেকে মূলধনী আয় কমে যাওয়া, লভ্যাংশ আয় হ্রাস এবং ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করেছে।
আইসিবির আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সঞ্চিত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে আরও ৫৮৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
আইসিবির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনায় পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বাজার দুর্বলতা এবং ঋণের সুদের চাপের কারণে সেই সিদ্ধান্ত এখন আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, আইসিবির ব্যাংক ঋণ গত এক দশকের বেশি সময়ে প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে। ২০১১ অর্থবছরে যেখানে ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ তা বেড়ে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
একই সময়ে বার্ষিক সুদ পরিশোধের পরিমাণও প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। ২০১১ সালে যেখানে সুদ বাবদ ব্যয় ছিল ১৮৫ কোটি টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১০১ কোটি টাকা।
এদিকে আইসিবির বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির অবাস্তবায়িত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। এর ফলে পোর্টফোলিওর প্রকৃত মূল্য নেমে এসেছে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়।
পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল
আইসিবির স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে কম খরচের ১০ হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন সংগ্রহ। এর মাধ্যমে তারল্য সংকট কমানো, উচ্চ সুদের ঋণ পরিশোধ এবং আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত অর্থের মধ্যে ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যবহার করা হবে উচ্চ সুদের ঋণ পরিশোধে। বাকি ৩ হাজার কোটি টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে আয় তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
ইতোমধ্যে আইসিবি সরকার থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা কম সুদের অর্থায়ন পেয়েছে। এর একটি অংশ বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ এবং বাজারে বিনিয়োগে ব্যবহার করা হয়েছে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় আইসিবির আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা ঋণকে ইকুইটিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক ঋণদাতাদের জন্য নির্দিষ্ট আয়ের অগ্রাধিকার শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি ঋণকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দীর্ঘমেয়াদে আইসিবি আয়ের উৎস বৈচিত্র্যময় করার পরিকল্পনা করছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন বিনিয়োগ পণ্য চালু এবং কার্যক্রম আধুনিকায়নের মাধ্যমে আরও টেকসই ব্যবসায়িক কাঠামো তৈরি করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের পুঁজিবাজারে আইসিবির ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের বাজার দুর্বলতা, অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা এবং বিনিয়োগ ঝুঁকি প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতায় বড় চাপ তৈরি করেছে।
এখন আইসিবির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঋণের বোঝা কমিয়ে আবারও একটি শক্তিশালী বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া। সফলভাবে পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশের পুঁজিবাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

