দেশের দুই পুঁজিবাজারেই গত সপ্তাহ কেটেছে নিম্নমুখী প্রবণতায়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) পাঁচ কার্যদিবসে প্রধান সূচক কমেছে প্রায় ১ শতাংশ। চট্টগ্রামের বাজারেও সূচকের একই চিত্র দেখা গেছে। বেশির ভাগ খাতের শেয়ারে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবে সামগ্রিক মন্দার মধ্যেও বস্ত্র ও পাট খাত ইতিবাচক রিটার্ন দিয়ে ব্যতিক্রম হিসেবে নজর কেড়েছে।
ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের সপ্তাহের তুলনায় ৪৭ পয়েন্ট হারিয়েছে। সপ্তাহ শেষে সূচকটি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৩২ পয়েন্টে, আগের সপ্তাহে যা ছিল ৫ হাজার ৫৭৮ পয়েন্ট। বাজারের বড় ও নির্বাচিত কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস-৩০ সূচক কমেছে ৯ পয়েন্ট। এটি এখন ২ হাজার ১০৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে, আগের সপ্তাহে ছিল ২ হাজার ১১২। শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানির সূচক ডিএসইএস কমেছে ১৬ পয়েন্ট। সপ্তাহ শেষে সূচকটি ১ হাজার ১০০ পয়েন্টে নেমে এসেছে, আগের সপ্তাহে যা ছিল ১ হাজার ১১৬।
তিনটি সূচকের পতনের হার তুলনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রধান সূচক ও শরিয়াহ সূচক তুলনামূলক বেশি কমেছে, আর বাছাই করা বড় কোম্পানির সূচক ডিএস-৩০ কমেছে সবচেয়ে কম, শতাংশের হিসাবে প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। এর অর্থ, চাপটা বেশি পড়েছে বাজারের বিস্তৃত অংশে, অর্থাৎ মাঝারি ও ছোট মূলধনের শেয়ারে। বড় কোম্পানিগুলো তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল।
বাজারের বিস্তৃত দুর্বলতার প্রমাণ মেলে দর ওঠানামার হিসাবে। গত সপ্তাহে ডিএসইতে মোট ৩৮৩টি কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট বন্ডের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ৮৯টির, আর কমেছে ২৮০টির। অপরিবর্তিত ছিল ১৪টি। আরও ২৮টি ইস্যুতে কোনো লেনদেনই হয়নি। হিসাব কষলে দেখা যায়, লেনদেন হওয়া প্রতি ১০০টির মধ্যে প্রায় ৭৩টির দর কমেছে, বেড়েছে ২৩টির মতো। এমন অনুপাত সাধারণত বিক্রয়চাপের ব্যাপকতা এবং ক্রেতাদের সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
সূচক নিচে নামানোর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে কয়েকটি ভারী কোম্পানি। এর মধ্যে আছে পূবালী ব্যাংক, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ, এলএইচবি, ব্যাংক এশিয়া ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো। সূচক যেহেতু বাজার মূলধনের ভারে গণনা হয়, তাই বড় মূলধনের কয়েকটি শেয়ারের দরপতন পুরো সূচকে বড় প্রভাব ফেলে। তালিকায় একাধিক ব্যাংকের উপস্থিতি ব্যাংক খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতিকেও সামনে আনছে।
খাতভিত্তিক লেনদেনে গত সপ্তাহে আধিপত্য ছিল বস্ত্র খাতের। ডিএসইর মোট লেনদেনের ২৬ দশমিক ৪ শতাংশই এসেছে এই খাত থেকে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সাধারণ বীমা খাতের দখলে ছিল ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে ওষুধ ও রসায়ন খাত, তাদের অংশ ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। মিউচুয়াল ফান্ড ৮ শতাংশ নিয়ে চতুর্থ এবং ব্যাংক খাত ৬ দশমিক ১ শতাংশ নিয়ে পঞ্চম স্থানে ছিল।
এই তালিকায় প্রথম দুটি খাত মিলেই লেনদেনের প্রায় ৪৫ শতাংশ দখল করেছে। অর্থাৎ বাজারের লেনদেন কয়েকটি খাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। এটি অনেক সময় বাজারে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশের ফটকা বা স্বল্পমেয়াদি মুনাফার প্রবণতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে ভারী ভূমিকা রাখা ব্যাংক খাত লেনদেনে পিছিয়ে থাকা বাজারের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
রিটার্নের হিসাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সেবা খাতে, সপ্তাহের ব্যবধানে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। কাগজ খাতে নেতিবাচক রিটার্ন ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। সিরামিক ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তা ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং সিমেন্ট খাতে ২ দশমিক ৮ শতাংশ। এর বিপরীতে ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে মাত্র দুটি খাতে। বস্ত্র খাতে ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং পাট খাতে ১ দশমিক ৩ শতাংশ।
বস্ত্র খাতের এই ব্যতিক্রমী অবস্থান কৌতূহল জাগায়। একই সপ্তাহে খাতটি লেনদেনের শীর্ষে ছিল এবং রিটার্নও ছিল ইতিবাচক। এর সম্ভাব্য একটি কারণ হতে পারে সুতা আমদানির নীতি নিয়ে চলমান আলোচনা। সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের পর দেশীয় সুতাকলের ব্যবসা বাড়ার সম্ভাবনার খবর সম্প্রতি সামনে এসেছে। বিনিয়োগকারীরা সেই প্রত্যাশায় এই খাতের শেয়ারে আগ্রহ দেখিয়ে থাকতে পারেন। তবে এটি একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা মাত্র, নিশ্চিত কারণ নয়। বিষয়টি এখনো নীতিগত অনিশ্চয়তায় ঝুলে আছে। তাই এই প্রবণতা কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
চট্টগ্রামের বাজারেও ছবিটি প্রায় একই। চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই প্রায় ১ শতাংশ কমে ১৪ হাজার ৮৩২ পয়েন্টে নেমেছে। আগের সপ্তাহে সূচকটি ছিল ১৪ হাজার ৯১২ পয়েন্টে। সিএসসিএক্স সূচকও প্রায় ১ শতাংশ কমে ৯ হাজার ১০১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা আগে ছিল ৯ হাজার ১৪৮।
সিএসইতে গত সপ্তাহে মোট ১৩৮ কোটি টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে। লেনদেন হওয়া ২৯৩টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১০৭টির, কমেছে ১৬৯টির। অপরিবর্তিত ছিল ১৭টি। এখানেও দরপতনের পাল্লা ভারী, তবে ঢাকার তুলনায় চিত্রটি কিছুটা নরম। সিএসইতে প্রায় ৫৮ শতাংশ ইস্যুর দর কমেছে, আর বেড়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশের। ডিএসইতে দর কমার হার ছিল প্রায় ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ চট্টগ্রামের বাজারে বিক্রয়চাপ তুলনামূলক কম ছিল।
সব মিলিয়ে গত সপ্তাহের চিত্র বলছে, দেশের পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট এখনো কাটেনি। সূচকের পতন এক শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকলেও দর কমা শেয়ারের সংখ্যা এবং খাতভিত্তিক রিটার্নের বণ্টন উদ্বেগের ছবিই তুলে ধরে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজার ঘুরে দাঁড়াতে হলে নীতিগত স্থিতিশীলতা, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের মান এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো জরুরি। বিশেষ করে ব্যাংকের মতো ভারী খাতগুলোতে স্বচ্ছতা বাড়লে সূচকের গতিপথেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য এই পরিস্থিতি সতর্কতার বার্তা বহন করে। একটি-দুটি খাতের ইতিবাচক রিটার্ন দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে কোম্পানির মৌলিক অবস্থা যাচাই করা বেশি নিরাপদ। একই সঙ্গে নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল খাতগুলোর শেয়ারে ঝুঁকিও বেশি। আগামী সপ্তাহগুলোতে সরকারি নীতি-সিদ্ধান্ত, ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের গতিই ঠিক করবে দেশের পুঁজিবাজার কোন পথে হাঁটবে।

