পুঁজিবাজারে লেনদেন কমে যাওয়ার ধাক্কা লেগেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আয় ও মুনাফায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের প্রধান এই শেয়ারবাজারের নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় কমেছে ৪৯ শতাংশ। একই সময়ে মূল পরিচালন কার্যক্রমে লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। মুনাফা কমায় সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য প্রস্তাবিত নগদ লভ্যাংশও নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে।
অথচ এর বিপরীতে ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ ও বিভিন্ন কমিটির সভায় অংশ নেওয়ার জন্য পরিচালকদের সম্মানি দ্বিগুণ করা হয়েছে। ডিএসইর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী এবং পরিচালকদের সম্মানিসংক্রান্ত পর্ষদ নথি পর্যালোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডিএসইর নিট মুনাফা ছিল ৬১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩১ কোটি ২০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে মুনাফা কমেছে প্রায় ৩০ কোটি ৯ লাখ টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ৪৯ শতাংশ। পরিচালন আয়ের চিত্রও একই রকম। আগের অর্থবছরে পরিচালন রাজস্ব ছিল ১২৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা, যা পরের অর্থবছরে কমে প্রায় ১০১ কোটি টাকায় নেমেছে।
বাজারে লেনদেন কমলে লেনদেননির্ভর বিভিন্ন ফি ও পরিচালন আয়ও কমে যায়। কিন্তু আয় কমলেও ডিএসইর খরচ থেমে থাকেনি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবনের অবচয়সহ নানা ব্যয় আগের মতোই চলেছে। এর ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন লোকসান হয়েছে ৪৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে এই লোকসান ছিল ২০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে পরিচালন লোকসান বেড়েছে প্রায় ২৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
মূল ব্যবসায় লোকসান হলেও অন্যান্য খাত থেকে ভালো আয় এসেছে ডিএসইর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকে রাখা স্থায়ী আমানত (এফডিআর), সরকারি ট্রেজারি বন্ডসহ বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে সুদ ও অন্যান্য আয় হয়েছে ১২১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এই আয়ই মূল কার্যক্রমের লোকসান সামাল দিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ফলে প্রায় ৫০ কোটি টাকা পরিচালন লোকসানের পরও বছর শেষে ৩১ কোটি ২০ লাখ টাকা নিট মুনাফা দেখাতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ ডিএসইর মুনাফার বড় অংশ এসেছে স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালনা থেকে নয়, বরং বিনিয়োগ ও অন্যান্য আয় থেকে।
মুনাফা কমার প্রভাব পড়েছে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশেও। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছিল। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে তা ছিল ৩৩ পয়সা। ওই বছর লভ্যাংশ বাবদ মোট বিতরণ হয়েছিল ৫৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ডিএসইর পর্ষদ ১ দশমিক ৭০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশের সুপারিশ করেছে। এতে প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে লভ্যাংশ দাঁড়াচ্ছে ১৭ পয়সা। আগের বছরের চেয়ে শেয়ারপ্রতি লভ্যাংশ কমেছে ১৬ পয়সা, শতাংশের হিসাবে প্রায় ৪৮ শতাংশ।
এমন সময়েই পরিচালকদের সভায় অংশ নেওয়ার সম্মানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ডিএসইর ১১০২তম পর্ষদ সভায় নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটির (এনআরসি) সুপারিশের ভিত্তিতে সম্মানি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। আগে পর্ষদ সভায় অংশ নিলে প্রতি পরিচালক ১০ হাজার টাকা করে সম্মানি পেতেন। নতুন সিদ্ধান্তে তা বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা, যার সঙ্গে প্রযোজ্য ভ্যাট ও কর যুক্ত হবে। অর্থাৎ প্রতি সভায় সম্মানি বেড়েছে ১০ হাজার টাকা বা ১০০ শতাংশ।
এই বাড়তি সম্মানি শুধু মূল পর্ষদ সভার জন্য নয়। পর্ষদের গঠন করা বিভিন্ন উপকমিটির সভাতেও একই হারে সম্মানি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব কমিটির মধ্যে আছে অডিট অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটি, নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটি ও রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স কমিটি। পাশাপাশি চেয়ারম্যানের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা সম্মানি ঠিক করা হয়েছে। ডিএসইর একটি সূত্র জানিয়েছে, আগে চেয়ারম্যানের সম্মানি ছিল ৩০ হাজার টাকা, যা এখন বেড়ে ৫০ হাজার টাকা হয়েছে। পরিচালকদের সম্মানি ও চেয়ারম্যানের মাসিক সম্মানিসংক্রান্ত এই সিদ্ধান্ত শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের জন্য ডিএসইর ৬৪তম বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) উপস্থাপন করা হয়।
সম্মানি বাড়ানোর পেছনে কী যুক্তি ছিল, সে বিষয়ে ডিএসইর সূত্র জানায়, এনআরসির সুপারিশে পরিচালকদের দায়িত্ব ও কাজের পরিধি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পুঁজিবাজার সংস্কার, নতুন নীতিমালা প্রণয়ন এবং বিভিন্ন কমিটির কার্যক্রম বাড়ায় পরিচালকদের আগের চেয়ে বেশি সময় ও মনোযোগ দিতে হচ্ছে। এসব বিবেচনাতেই সম্মানি সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে ডিএসইর আর্থিক ফলাফলের পাশে সম্মানি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে রাখলে প্রশ্ন উঠছে, প্রতিষ্ঠানের ব্যয় ও পরিচালকদের সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণে শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
সম্মানি বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন কালবেলাকে বলেন, একজন স্বতন্ত্র পরিচালককে একটি বোর্ড সভায় অংশ নিতে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় দিতে হয়। আসা-যাওয়ার সময় ধরলে প্রায় পুরো একটি দিনই চলে যায়। মাসে এক বা দুটি সভা হতে পারে। এর বাইরেও পরিচালকদের নানা দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাঁর ভাষ্য, প্রায় ১০ বছর আগে সম্মানি ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তখনকার অর্থনৈতিক বাস্তবতা আর এখনকার বাস্তবতা এক নয়, তখন ডলারের দামও অনেক কম ছিল। দীর্ঘ সময় পর তাই সম্মানি বাড়ানো হয়েছে। তাঁর হিসাবে, এর ফলে বছরে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা বাড়তি ব্যয় হতে পারে।

