বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এখনো অত্যন্ত সীমিত। দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি হলেও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী বেনিফিশিয়ারি ওনার্স বা বিও হিসাবের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম মানুষ সরাসরি শেয়ারবাজারের সঙ্গে যুক্ত।
তবে বিও হিসাবের সংখ্যা প্রকৃত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা পুরোপুরি তুলে ধরে না। কারণ অনেক বিনিয়োগকারীর একাধিক হিসাব রয়েছে, যেখানে শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড, বন্ডসহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক পণ্য সংরক্ষণ করা হয়। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, প্রকৃত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা হয়তো ২ লাখের বেশি নয়। সে হিসাবে দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় শেয়ারবাজারে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী মানুষের হার ০ দশমিক ১ শতাংশেরও নিচে হতে পারে।
এই চিত্রটি দেশের বিপুল সংখ্যক ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে তুলনা করলে আরও স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১৯ কোটির বেশি হলেও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে মানুষের আগ্রহ খুবই কম।
এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। ভারতে প্রায় ৬ শতাংশ মানুষ শেয়ারবাজারে অংশগ্রহণ করেন। নেপালে এই হার প্রায় ২৬ শতাংশ। যদিও ভারতের জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় ৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাই নেপালের ২৬ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি।
উন্নত দেশগুলোতে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শেয়ারবাজার। সেখানে নাগরিকরা দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও সম্পদ বৃদ্ধির একটি মাধ্যম হিসেবে শেয়ার, বন্ড ও অন্যান্য আর্থিক পণ্যে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি এখনো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি।
তবে মানুষের স্বভাবগতভাবে শেয়ারবাজারে অনাগ্রহ রয়েছে—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১০ সালের ঘটনায়। ওই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ শেয়ারবাজারে প্রবেশ করেছিলেন এবং বিও হিসাবের সংখ্যা ৩৩ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু ২০১০ সালের ভয়াবহ বাজার ধসের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। অনেক বিনিয়োগকারী বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন এবং ধীরে ধীরে বাজার থেকে সরে যেতে থাকেন। সেই ধসের প্রভাব এখনো বিনিয়োগকারীদের আস্থায় রয়েছে।
শেয়ারবাজারে মানুষের অংশগ্রহণের প্রধান চালিকা শক্তি হলো লাভের সম্ভাবনা। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক বিনিয়োগকারী প্রতারণামূলক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অনিয়মপূর্ণ আর্থিক প্রতিবেদন এবং দুর্বল কোম্পানির কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
এমনকি ভালো আর্থিক অবস্থার কিছু প্রতিষ্ঠানও পর্যাপ্ত নগদ লভ্যাংশ দেয় না। অনেক কোম্পানির ব্যাংকে শত শত কোটি টাকা জমা থাকলেও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত সুবিধা না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ফলে ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেও অনেক বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেননি। এর কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে শেয়ারবাজার নিয়ে আগ্রহ কমেছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো বাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা সীমিত। মাত্র ১০ থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার নিয়মিত ভালো মুনাফা দিয়েছে। এর বাইরে কম মূলধনের দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা অনেক বিনিয়োগকারীকে ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারের দিকে আকৃষ্ট করেছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি বাজার কারসাজির সুযোগও তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে কারসাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা বিনিয়োগকারীদের কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি। ফলে বাজারে আস্থার সংকট আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। বন্ধ মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ ১০ বছর বাড়ানো, কিছু প্রতিষ্ঠানের নতুন তহবিল সংগ্রহের অনুমোদন এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
উদাহরণ হিসেবে সিকদার ইন্স্যুরেন্সের কথা উল্লেখ করা যায়। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওতে যাওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটি তার জীবন তহবিলের প্রায় ৭২ শতাংশ দুর্বল শেয়ারে বিনিয়োগ করেছিল। এ ধরনের ঘটনা বাজারে ঝুঁকি ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কয়েকটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের আত্মসাৎ করা অর্থ বিনিয়োগকারীদের ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটানোর জন্য আরও বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং বাজার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন কমিশন বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষকে শেয়ারবাজারে ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু সূচক বাড়ানো বা লেনদেন বৃদ্ধি নয়, বরং বাজারের ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনা, তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করা, ডিজিটাল ব্যবস্থা উন্নত করা এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী শেয়ারবাজারের পাশাপাশি কার্যকর বন্ড বাজারও প্রয়োজন। বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এই বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত বাজারের নিয়ম ঠিক রাখা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহি তৈরি করা। শেয়ারবাজারের সূচক বা দৈনিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং একটি স্বচ্ছ ও নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশ যখন বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে এমন একটি শেয়ারবাজার তৈরি করা যেখানে সাধারণ মানুষ আস্থা নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারবেন। কারণ বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরে না এলে দেশের পুঁজিবাজারের প্রকৃত বিকাশ সম্ভব নয়।

