এক বছরে মুনাফা দ্বিগুণের বেশি হওয়ার খবরে গত সপ্তাহে শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বেশি আলোচিত কোম্পানি হয়ে উঠেছে এপেক্স ফুডস। মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৬৯ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। এতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দর বৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদিকে একই সপ্তাহে বাজারের সামগ্রিক সূচক ও লেনদেন দুটোই কমেছে।
ডিএসইর সাপ্তাহিক বাজার পর্যালোচনা থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এতে দেখা যায়, বাজারের সার্বিক চিত্র যখন নিম্নমুখী, তখনো নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির শেয়ার আলাদাভাবে বিনিয়োগকারীদের নজর কেড়েছে।
গত সপ্তাহে এপেক্স ফুডস ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করে। একই সঙ্গে শেয়ারধারীদের জন্য লভ্যাংশের ঘোষণাও দেয় তারা। প্রতিবেদনে দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই খবর বাজারে ছড়িয়ে পড়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ারটি কেনার আগ্রহ হঠাৎ বেড়ে যায়, আর তার প্রভাব পড়ে দামে।
আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুনে শেষ হওয়া ২০২৫–২৬ অর্থবছরে কোম্পানিটি ৮ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে। এর আগের অর্থবছরে মুনাফা ছিল ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে মুনাফা ৪ কোটি টাকারও বেশি বেড়েছে, যা আগের বছরের দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। মুনাফার পাশাপাশি কোম্পানির শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্যও (এনএভি) বেড়েছে।
গত ৪ অক্টোবর কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সভায় অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। ওই সভাতেই শেয়ারধারীদের জন্য ২০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরদিন ৫ অক্টোবর দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের এসব তথ্য জানানো হয়।
তথ্য প্রকাশের দিনই বাজারে শেয়ারটির দাম এক লাফে ৫১ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে যায়। পরের দুই কার্যদিবসেও দাম বাড়ার প্রবণতা বজায় থাকে। ফলে লভ্যাংশ ঘোষণার পর তিন কার্যদিবসে প্রতিটি শেয়ারের দাম মোট ৭৯ টাকা বেড়ে যায়। তবে গত বৃহস্পতিবার কিছু বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে নিলে শেয়ারটির দাম ১১ টাকা কমে। এরপরও সপ্তাহ শেষে সার্বিক হিসাবে দর বৃদ্ধির শীর্ষ স্থানটি ধরে রাখে কোম্পানিটি।
মুনাফা বাড়ার কারণ হিসেবে কোম্পানি দুটি বিষয় তুলে ধরেছে। প্রথমত, গত অর্থবছরে মূল ব্যবসা থেকে তাদের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা সরাসরি মুনাফায় প্রতিফলিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, শেয়ারবাজারে কোম্পানির নিজস্ব বিনিয়োগ আছে। সেসব শেয়ারের দাম বাড়ায় কোম্পানির সম্পদমূল্যও বেড়েছে। অর্থাৎ মুনাফার বৃদ্ধি শুধু ব্যবসায়িক আয়ের ওপর নির্ভর করেনি, বিনিয়োগ থেকে পাওয়া সুবিধাও এতে ভূমিকা রেখেছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য এই পার্থক্য বোঝা জরুরি, কারণ ব্যবসা থেকে আসা আয় সাধারণত দীর্ঘমেয়াদে বেশি টেকসই হয়। অন্যদিকে শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধিনির্ভর সম্পদমূল্য বাজারের ওঠানামার ওপর নির্ভর করে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দাম এত দ্রুত বাড়ার পেছনে কোম্পানির মুনাফার খবরের পাশাপাশি এর মূলধন কাঠামোও বড় ভূমিকা রেখেছে। ১৯৮১ সালে তালিকাভুক্ত এপেক্স ফুডস বাজারের অন্যতম স্বল্পমূলধনি কোম্পানি। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানির মোট পরিশোধিত মূলধন ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এই মূলধন ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের ৫৭ লাখ শেয়ারে বিভক্ত।
এই ৫৭ লাখ শেয়ারের ৩০ লাখের বেশি রয়েছে কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে। নিয়ম অনুযায়ী, আগে ঘোষণা না দিয়ে তাঁরা এসব শেয়ার বিক্রি করতে পারেন না। ফলে খোলা বাজারে নিয়মিত কেনাবেচার জন্য থাকে মাত্র ২৭ লাখের মতো শেয়ার, যা মোট শেয়ারের অর্ধেকেরও কম।
এমন পরিস্থিতিতে ভালো খবর এলে ক্রেতার সংখ্যা দ্রুত বাড়ে, কিন্তু বিক্রির জন্য শেয়ার থাকে সীমিত। চাহিদা ও জোগানের এই অসামঞ্জস্যের কারণে অল্প পরিমাণ শেয়ার কেনাবেচাতেই দাম অনেকটা বেড়ে যেতে পারে। বাজারসংশ্লিষ্টরা এটিকেই এপেক্স ফুডসের দাম লাফিয়ে বাড়ার প্রধান কারণ বলছেন। তাঁদের মতে, কোম্পানির মুনাফা বাড়া একটি ইতিবাচক খবর, তবে এত অল্প সময়ে এতটা দাম বৃদ্ধির পেছনে সীমিত শেয়ারসংখ্যার প্রভাবও কম নয়।
লেনদেনের দিক থেকেও গত সপ্তাহে এপেক্স ফুডস ছিল আলোচনায়। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহ শেষে লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির তালিকায় কোম্পানিটির অবস্থান ছিল নবম। সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। মাত্র ২৭ লাখ শেয়ার খোলা বাজারে থাকা একটি কোম্পানির জন্য এই লেনদেন যথেষ্ট বড়। এতে বোঝা যায়, শেয়ারটি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কতটা তীব্র ছিল।
শুধু এপেক্স ফুডস নয়, গত সপ্তাহে দাম বাড়ার তালিকার শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির সবগুলোই স্বল্পমূলধনি। এপেক্স ফুডসের পরে দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম স্থানে ছিল যথাক্রমে বিডিল্যাম্পস, আজিজ পাইপস, সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্স ও সোনালী আঁশ।
এর মধ্যে বিডিল্যাম্পসের শেয়ারের দাম পাঁচ কার্যদিবসে ৩৯ টাকা বা ১৭ শতাংশ বেড়েছে। আজিজ পাইপসের দাম বেড়েছে ১০ টাকা বা ১৩ শতাংশ। সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সের দাম ১১ টাকা বা সাড়ে ১২ শতাংশ এবং সোনালী আঁশের দাম ২৭ টাকা বা সোয়া ১২ শতাংশ বেড়েছে।
এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, বাজারে এখন বড় ও মাঝারি মূলধনি কোম্পানির তুলনায় ছোট কোম্পানির শেয়ারেই বেশি ওঠানামা হচ্ছে। এসব কোম্পানির শেয়ারসংখ্যা কম থাকায় দাম দ্রুত বাড়ে, আবার দ্রুত কমারও ঝুঁকি থাকে। তাই এ ধরনের শেয়ারে বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা ও শেয়ারের সার্বিক জোগান ভালোভাবে যাচাই করা বিনিয়োগকারীদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ।
বাজারের সার্বিক চিত্র অবশ্য গত সপ্তাহে ছিল ভিন্ন। কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লেও ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের সপ্তাহের তুলনায় ৫৬ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৪৭৬ পয়েন্টে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমেছে, শুধু হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির দাম বেড়েছে।
সূচকের তুলনায় লেনদেনের পতন আরও স্পষ্ট। গত সপ্তাহে ডিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেন আগের সপ্তাহের চেয়ে ২১ শতাংশের বেশি কমে ৫৫৬ কোটি টাকায় নেমেছে। তার আগের সপ্তাহে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৭০৬ কোটি টাকা। লেনদেন কমে যাওয়ার অর্থ হলো, সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগকারীরা বাজারে সতর্ক অবস্থানে আছেন এবং বড় আকারে নতুন অর্থ ঢালতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
সব মিলিয়ে গত সপ্তাহের বাজারে দুটি পরিষ্কার চিত্র দেখা গেছে। একদিকে ভালো আর্থিক ফল ও লভ্যাংশের খবরে নির্দিষ্ট কিছু স্বল্পমূলধনি কোম্পানির শেয়ারে দ্রুত দাম বেড়েছে। অন্যদিকে সার্বিক বাজারে সূচক ও লেনদেন কমেছে। এই দুই চিত্রের মধ্যে ব্যবধান ইঙ্গিত দেয়, বাজারে এখনো বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি। তাঁরা মূলত নির্দিষ্ট খবর বা কোম্পানিনির্ভর সুযোগ খুঁজছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এ অবস্থায় শুধু দাম বাড়ার প্রবণতা দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে কোম্পানির মৌলভিত্তি, মুনাফার ধারাবাহিকতা এবং শেয়ারের জোগানের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

