ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অকার্যকর ও উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে এখন ৩৭টিতে পৌঁছেছে, যার মধ্যে কেবল এই চলতি বছরই যুক্ত হয়েছে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত বাবুল বর্মণের এক বিশেষ প্রতিবেদনে দেশের শেয়ারবাজারের একটি গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান ‘সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল’-এর কারখানায় ডিএসইর পরিদর্শন দল গিয়ে তালা ঝুলতে দেখে প্রতিষ্ঠানটিকে নিষ্ক্রিয় কোম্পানির খাতায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। বহু বছর আগে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার আইপিও মূলধন তুলে নেওয়ার পর একের পর এক কোম্পানির এভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের পুঁজিবাজারের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
শেয়ারবাজারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৬টি নিবন্ধিত কোম্পানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, আর ২০০২ সাল থেকে কারখানা বন্ধ রেখে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদে অকার্যকর থাকার রেকর্ড ধরে রেখেছে ‘মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ’। আবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে একীভূত হয়ে গেছে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক এবং অবলুপ্তির বা লিকুইডেশনের তালিকায় নাম উঠেছে তিনটি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের। অনেক কোম্পানি বিশাল ঢাকঢোল পিটিয়ে শেয়ারবাজারে এসে কোটি কোটি টাকার মূলধন তুলে নিলেও কয়েক বছরের মাথায় উদ্যোক্তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পরিচালনা পর্ষদের আর্থিক অনিয়ম, ঋণখেলাপি কিংবা আইনি জটিলতায় হারিয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৩ সালে আইপিওর মাধ্যমে বাজার থেকে ২২০ কোটি টাকা তোলা ‘অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স’ ব্যাপক জালিয়াতি ও পরিচালকদের অর্থ আত্মসাতের খপ্পরে পড়ে ২০২০ সাল থেকেই পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এমনকি ‘ফ্যামিলিটেক্স (বিডি)’-এর মতো কোনো কোনো কোম্পানির ভৌত সম্পত্তি বা কারখানা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, যা অননুমোদিতভাবে বেসরকারি মালিকানায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
তালিকায় থাকা অধিকাংশ ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পেছনে বিদ্যুৎ ও তীব্র গ্যাস সংকট এবং ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাব বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন; পর্যাপ্ত গ্যাস প্রেসার না পাওয়ায় দুই বছর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পর গত বছরের জুনে কারখানার কাজ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় ‘হামিদ ফ্যাব্রিক্স’। অন্যদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ও মালিক দেশ ছেড়ে পালানোর পর ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ হওয়ায় কাঁচামাল ও দক্ষ জনবলের সংকটে চলতি বছরের আগস্টে উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করে ‘এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস’। আবার ২০১৫ সালে ৪৫ কোটি টাকা তুলে নেওয়া সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল ২০১৭ সালে প্রথম বন্ধ হয়; পরে ২০২১ সালে ‘আলিফ গ্রুপ’ এটি অধিগ্রহণ করে ২০২২ সালে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করলেও আবারও তা থমকে গেছে। নিয়মিত তথ্য প্রকাশ না করা, বার্ষিক সাধারণ সভা না করা এবং আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের সাথে ঘোষিত মার্জার বা একীভূতকরণ ঝুলে থাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির আর্থিক অবস্থা নিয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারের মধ্যে রয়েছেন।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, যেসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন নেই, শ্রমিক নেই এবং বছরের পর বছর ধরে যন্ত্রপাতিগুলোতে মরিচা ধরছে, সেসব কোম্পানির শেয়ার দর হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষকরা স্পষ্ট সতর্ক করে জানিয়েছেন যে কোনো বাস্তব অর্থনৈতিক কারণ ছাড়াই গ্যাম্বলিং বা কারসাজিজোট ও স্পেকুলেটিভ ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে এসব জাঙ্ক শেয়ারের দাম ফোলানো হচ্ছে। মে ২০২৫ থেকে বন্ধ থাকা ‘আজিজ পাইপস’-এর শেয়ার দর গত এক মাসে প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়েছে, যার মধ্যে কেবল এক দিনেই প্রায় ১০ শতাংশ দাম বাড়ে। একইভাবে দুই দশক ধরে বন্ধ থাকা মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার দর এক মাসে ২৫ শতাংশ, ছয় বছর ধরে বন্ধ থাকা ‘তুং হাই নিটিং’-এর দর ২২ শতাংশ এবং ২০২০ সাল থেকে উৎপাদনহীন ‘শ্যামপুর সুগার মিলস’-এর শেয়ারের দর ৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যা অনভিজ্ঞ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য এক মৃত্যুকূপ তৈরি করছে।
ডিএসইর পরিচালকরা নিশ্চিত করেছেন যে কোম্পানিগুলো তাদের প্রকৃত তথ্য গোপন করায় এখন মাঠপর্যায়ে সরাসরি সরজমিন পরিদর্শন জোরদার করা হয়েছে। তবে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ মনে করেন, কেবল নিয়মিত পরিদর্শন করে এই মেগা সংকটের সমাধান হবে না। যেসব কোম্পানির ব্যবসা পুনরায় চালুর সুযোগ রয়েছে, তাদের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে রিভাইভাল প্ল্যান সাবমিট করতে বাধ্য করতে হবে, আর যেসব কোম্পানি স্থায়ীভাবে দেউলিয়া বা ভুয়া হয়ে গেছে, সেগুলোকে দ্রুত ডি-লিস্টিং বা তালিকাচ্যুত করার বিশেষ পরিকল্পনা নিতে হবে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান সম্প্রতি দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করার কথা জানালেও কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করেননি, যা শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারী সুরক্ষায় দ্রুত বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।

