ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এজ’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মিথ্যা তথ্য, ভুয়া বিনিয়োগ স্ক্যাম এবং কারসাজির কারণে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধস নামছে। ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইক ২০২৬ উপলক্ষ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে এই তীব্র উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেন ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। আলোচনায় উঠে আসে কীভাবে পেশাদার আর্থিক বিশ্লেষণ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া লোগো ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে একটি সুসংগঠিত চক্র।
ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম সেমিনারে কিছু সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল প্রতারণার কৌশল তুলে ধরে সতর্ক করেন। তিনি জানান, চতুর স্ক্যামাররা নিজেদের নামিদামি ফাইনান্সিয়াল এনালিস্ট বা বাজার বিশ্লেষক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে এবং আস্থা অর্জনের জন্য ডিএসই বা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লোগো অবৈধভাবে ব্যবহার করছে। ফেসবুক বা টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে ‘মাত্র ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে দুই সপ্তাহের মধ্যে ২ লাখ টাকা বানিয়ে দেওয়া হবে’ এমন অবাস্তব ও রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রলোভন দিয়ে পুঁজি হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্রটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের সুযোগ নিয়ে এসব ভুয়া পরামর্শ আর কৃত্রিম বিশ্লেষণের তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আসল তথ্য থেকে দূরে সরিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ডিএসই প্রধান মনে করেন, শুধু মুখে নিয়মকানুনের কথা বা নীতিমালার ভয় দেখিয়ে ডিজিটাল যুগের এই প্রতারণা থামানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিএসইসি এবং ডিএসইর আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ এবং দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ। বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত সচেতন করার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে শক্তিশালী ব্রোকারেজ হাউস, প্রাতিষ্ঠানিক মার্চেন্ট ব্যাংক এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি বা এসেট ম্যানেজমেন্ট ফার্মগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। যখন এই মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তিগত ও নৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে, তখন গুজব ছড়ানোর সুযোগ অনেক কমে যাবে।
শেয়ারবাজারের বর্তমান সংকট তুলে ধরতে গিয়ে ডিএসই চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে বাজারের ভালো ও ইতিবাচক উদ্যোগগুলোর চেয়ে নেতিবাচক খবর বা গুজব বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক শুভ উদ্যোগগুলো সাধারণ মানুষের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো প্রচার বা যোগাযোগ বাজেটের সীমাবদ্ধতা। পর্যাপ্ত প্রচার বাজেটের অভাবে গুজব সৃষ্টিকারীদের সংগঠিত অপপ্রচারের বিপরীতে সত্য তথ্য তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই পুঁজিবাজারকে একটি বিশ্বাসযোগ্য কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে সংবাদমাধ্যম, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সামাজিক মাধ্যমে প্রতারণামূলক তথ্যের বিস্তার রুখতে সরকারি সদিচ্ছা ও বিএসইসির বর্তমান নেতৃত্বের নেওয়া নানা সংস্কারমূলক পদক্ষেপের ওপর আস্থা রাখার কথা বলেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। বিএসইসি এবং ডিএসই যৌথভাবে বাজার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং অনিয়মের মূল উপড়ে ফেলতে ডিজিটাল নজরদারি আরও জোরদার করছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা সোশ্যাল মিডিয়ার অনিশ্চিত পেইজ বা অপরিচিত মানুষের অবাস্তব প্রলোভনে কান না দিয়ে কেবল রেজিস্টার্ড ব্রোকারেজ হাউস এবং অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের তথ্যের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেন। সবার সচেতনতা ও সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে আমাদের শেয়ারবাজারকে একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগের স্থানে রূপান্তর করতে।

