ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সান-এ প্রকাশিত সাংবাদিক সাখাওয়াত হোসেন সুমনের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, দুর্বল আর্থিক পারফরম্যান্স, মুনাফায় বড় ধস এবং দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) প্ল্যাটফর্মের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসার প্রকৃত মৌলিক পরিস্থিতির সাথে শেয়ারের বাজারদরের এমন ফারাক শেয়ারবাজারে চরম ফটকাবাজি ও কৃত্রিম কারসাজির আশঙ্কা তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই এসএমই প্ল্যাটফর্মের সার্বিক সূচক ৪৩ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদনে বাজারে তালিকাভুক্ত নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির চাঞ্চল্যকর অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আল-মদিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মুনাফা ৩৩ শতাংশ কমে ১.১৮ কোটি টাকায় নামলেও এবং বিক্রি ২৫ শতাংশ হ্রাস পেলেও, ২০২৫ সালের শেষ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ১৫৩ শতাংশ বেড়ে ৭১.৩০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। একইভাবে পেপার অ্যান্ড বোর্ড প্রস্তুতকারক কোম্পানি ওয়েব কোটস-এর মুনাফা ২৯ শতাংশ কমার পরও শেয়ারের দর ১৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৮.৯০ টাকায় পৌঁছেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে অ্যাপেক্স ওয়েভিং অ্যান্ড ফিনিশিং মিলসে। গ্যাস ও বিদ্যুতের বকেয়া বিল পরিশোধ করতে না পারায় কোম্পানিটির উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কোম্পানির সচিব নিজেই নিশ্চিত করেছেন যে কারখানা চালুর কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই এবং এই অযৌক্তিক দরবৃদ্ধির পেছনের কারণ তাদের অজানা। তা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দর এক সময়ে ৭ টাকা থেকে লাফিয়ে ১৫ টাকায় উঠে যায়। এছাড়া মাস্টার ফিড অ্যাগ্রোটেকের মতো ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দামও কোনো দৃশ্যমান অর্থনৈতিক উন্নতি ছাড়াই দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
শেয়ারের দামের এমন অস্বাভাবিক উল্লম্ফন ও সন্দেহজনক লেনদেনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। বিএসইসি ডিএসইকে আল-মদিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ার লেনদেন, সমন্বিত কারসাজি এবং অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্যের ব্যবহার খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছে। একই সাথে কোম্পানিটির ৪১ কোটি টাকারও বেশি ট্রেড রিসিভেবল, অডিটরদের দায়িত্ব এবং আর্থিক হিসাবের সত্যতা নিয়ে বিস্তারিত তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
এসএমই প্ল্যাটফর্মে যেকোনো ধরনের কারসাজি রোধ করতে এবং সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অনাকাঙ্ক্ষিত আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে বিএসইসি গত ১৯ মে একটি নতুন নির্দেশনা জারি করে। ওই নির্দেশ অনুযায়ী, এসএমই বোর্ডের সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেন করতে হলে বিনিয়োগকারীদের ন্যুনতম পোর্টফোলিও বা বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
ডিএসইর পরিচালকদের মতে, এসএমই বোর্ডে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ফ্রি-ফ্লোট শেয়ার বা উন্মুক্তভাবে লেনদেনযোগ্য শেয়ারের সংখ্যা অত্যন্ত কম হওয়ায় অল্প কিছু অসৎ চক্র কৃত্রিমভাবে শেয়ারের সংকট তৈরি করে খুব সহজেই বাজারদর নিয়ন্ত্রণ বা ম্যানিপুলেট করতে পারে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের মূলধন হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন। বাজার বিশ্লেষকরা বিনিয়োগকারীদের কেবল দাম বাড়ার গ্রাফ দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বিনিয়োগের পূর্বে অবশ্যই শেয়ার প্রতি আয় (EPS), মূল্য-আয় অনুপাত (P/E Ratio), ক্যাশ ফ্লো, কোম্পানির খেলাপি ঋণ ও সাম্প্রতিক মূল্য সংবেদনশীল তথ্যাদি (PSI) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

