আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৪৯টি কোম্পানি এখন দুর্বল বা ‘জেড’ শ্রেণিতে নেমে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২১টি কোম্পানির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে কোম্পানি তালিকাভুক্তির মান, তদারকি এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ হয়ে যাওয়া ২১টি কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে ১ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। অন্যদিকে, বাকি ২৮টি কোম্পানি সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা তুলেছিল। অর্থাৎ, এই ৪৯টি কোম্পানির মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ব্যাংক ও মিউচুয়াল ফান্ড বাদে প্রায় ১৩০টি কোম্পানি দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। বর্তমানে ডিএসইর তালিকায় উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে ৩৭টিতে দাঁড়িয়েছে।
উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ খাতের ১০টি কোম্পানি হলো ফ্যামিলিটেক্স, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, হামিদ ফ্যাব্রিকস, নিউ লাইন ক্লথিংস, নূরানী ডাইং অ্যান্ড সোয়েটার, প্যাসিফিক ডেনিমস, রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস, শুরউইড ইন্ডাস্ট্রিজ, টুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইং এবং জাহিন স্পিনিং।
এ ছাড়া অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস, এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক, অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স, বারাকা পাওয়ার, এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ, জিবিবি পাওয়ার, খুলনা পাওয়ার কোম্পানি, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলস এবং ইয়াকিন পলিমারের মতো প্রতিষ্ঠানও উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। ডিএসইর তথ্য বলছে, এসব কোম্পানির বেশির ভাগ ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে উৎপাদন বন্ধ করেছে। তবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এরও আগে থেকে বন্ধ রয়েছে।
জেড শ্রেণিতে থাকা কয়েকটি কোম্পানি তালিকাভুক্তির সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছিল। ২০২৪ সালে তালিকাভুক্ত বেস্ট হোল্ডিংস পুঁজিবাজার থেকে ৩৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। ২০২১ সালে তালিকাভুক্ত লুব-রেফ বাংলাদেশ সংগ্রহ করে ১৫০ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে তালিকাভুক্ত ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড ১৫৭ কোটি টাকা, ২০১৩ সালে তালিকাভুক্ত ওরিয়ন ফার্মা ২৪০ কোটি টাকা এবং ২০১৮ সালে তালিকাভুক্ত বসুন্ধরা পেপার মিলস ২০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। ২০১৯ সালে তালিকাভুক্ত রিং শাইন টেক্সটাইলসের সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ ছিল ১৫০ কোটি টাকা।
তালিকাভুক্ত কোম্পানির উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে তাদের আয় কমে যায় বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শেয়ারের মূল্য ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও বিনিয়োগের আশায় পুঁজিবাজারে অর্থ রাখা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
নিউ এজকে দেওয়া বক্তব্যে ডিএসইর পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও বলেন, প্রায় ৯০ শতাংশ কোম্পানি মূলত পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। ডিএসইর চেয়ারম্যান মিনহাজ মান্নান ইমন জানান, আর্থিকভাবে দুর্বল কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করা এবং তাদের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে ডিএসইর আপত্তি থাকলেও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এসব অনুমোদন দিয়েছিল। তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে কোম্পানি বন্ধ হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ মনে করেন, অনেক কোম্পানি মূলত শেয়ার বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যেই পুঁজিবাজারে আসে। আবার কিছু কোম্পানির পরিচালক দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা বজায় রাখার পরিবর্তে নিজেদের শেয়ার বিক্রির দিকে বেশি মনোযোগ দেন। তাঁর মতে, দুর্বল কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেওয়ার ফলে পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকট আরও গভীর হয়েছে, যার মাশুল দিতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি ও আইপিও অনুমোদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার কারণে সংঘবদ্ধ অনিয়মের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। তাঁর মতে, পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন, অধিকতর স্বচ্ছতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সুশাসন জোরদার এবং বিদ্যমান দুর্বলতা দূর করার জন্য কাজ করছে। এসব উদ্যোগ কার্যকর হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং পুঁজিবাজারকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।

