শেয়ারবাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি সহজ করা, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অর্থ ব্যবহারে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিধিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে আইপিও ও রাইট শেয়ার অফারের (আরপিও) অর্থ থেকে ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ সীমা ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি চালু হতে পারে নতুন শেয়ার ইস্যু ও পুরোনো শেয়ার বিক্রি মিলিয়ে হাইব্রিড আইপিও পদ্ধতি। বিএসইসির ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত খসড়াটি এখন জনমত যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস।
হাইব্রিড পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো, কোম্পানি একদিকে নতুন শেয়ার ছেড়ে বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করবে, অন্যদিকে প্রাথমিক উদ্যোক্তা বা বিদ্যমান শেয়ারধারীরা নিজেদের হাতে থাকা কিছু শেয়ার বিক্রির সুযোগ পাবেন। পুরোনো শেয়ার বিক্রির এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘অফার ফর সেল’ বা ওএফএস। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: কোম্পানির নতুন শেয়ার বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ কোম্পানির তহবিলে যায়, কিন্তু বিদ্যমান শেয়ারধারীর শেয়ার বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ যায় বিক্রেতার কাছে। ফলে হাইব্রিড পদ্ধতিতে কোম্পানির মূলধন সংগ্রহের পাশাপাশি পুরোনো বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির সুযোগও তৈরি হবে। তবে প্রস্তাবটি সব কোম্পানির জন্য নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিদেশি মালিকানার কোম্পানি, অন্তত ৩০০ কোটি টাকা নিট সম্পদ থাকা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে নিবন্ধিত কোম্পানি অথবা ৫০০ কোটি টাকার বেশি বার্ষিক টার্নওভার বা মোট সম্পদ রয়েছে এমন কোম্পানি এই পদ্ধতির আওতায় আসতে পারে। হাইব্রিড ব্যবস্থায় নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে অন্তত ৫ শতাংশ শেয়ার জনসাধারণের কাছে ছাড়তে হবে। আইপিও ও ওএফএস মিলিয়ে মোট প্রস্তাবিত শেয়ারের পরিমাণও কোম্পানির তালিকাভুক্তির পর পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ হতে হবে।
এই পদ্ধতিতে পুরোনো শেয়ার বিক্রির জন্যও সময়সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। তালিকাভুক্তির প্রথম লেনদেনের দিন থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ওএফএসের আওতায় প্রতিশ্রুত শেয়ার বিক্রি শেষ করতে হবে। প্রথম দিনেই প্রতিশ্রুত শেয়ারের অন্তত ২৫ শতাংশ বিক্রির প্রস্তাব রাখা হয়েছে; অবশিষ্ট শেয়ার পরবর্তী ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে বিক্রি করতে হবে। আবার তালিকাভুক্তির এক বছরের মধ্যে ওএফএসের মাধ্যমে বিক্রি করা শেয়ারের পরিমাণ কোম্পানির তালিকাভুক্তির পর পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। উদ্দেশ্য হলো, পুরোনো শেয়ারধারীদের বিক্রির সুযোগ দিলেও বাজারে অতিরিক্ত শেয়ার সরবরাহ ও মালিকানা পরিবর্তনের বিষয়টি যেন নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে থাকে। তবে এ ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারীদের জন্য কোম্পানির নতুন ব্যবসায়িক মূলধন সংগ্রহ এবং পুরোনো শেয়ারধারীদের শেয়ার বিক্রির বিষয়টি আলাদা করে বোঝা জরুরি।
আইপিওর আগে আর্থিক তথ্য যাচাইয়ের নিয়মেও পরিবর্তন আসতে পারে। খসড়া অনুযায়ী, আবেদন জমা দেওয়ার আগেই বিএসইসির নির্ধারিত নিরীক্ষক প্যানেল থেকে নির্বাচিত নিরীক্ষকের মাধ্যমে কোম্পানির আর্থিক তথ্য যাচাই করাতে হবে। আর্থিক বিবরণী ও প্রসপেক্টাসে দেওয়া তথ্যের নির্ভুলতা, সত্যতা এবং পূর্ণতা যাচাই করে নিরীক্ষককে প্রতিবেদন দিতে হবে, যা প্রসপেক্টাসের সঙ্গে প্রকাশ করতে হবে। বর্তমানে কোম্পানি নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী জমা দিলেও আইপিও আবেদনের আগে এ ধরনের পৃথক যাচাই প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক নয়। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে আবেদন জমার আগেই তথ্যের অসংগতি শনাক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার সময় কমতে পারে। একই সঙ্গে খসড়ায় স্টক এক্সচেঞ্জকে আবেদন পাওয়ার ২০ দিনের মধ্যে কোম্পানির আর্থিক বিবরণী ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনা এবং কারখানা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন শেষ করার সময়সীমাও প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের আরেকটি দিক হলো, আইপিও বা আরপিও থেকে পাওয়া অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণে পৃথক এসক্রো হিসাব চালু করা। নির্ধারিত তফসিলি ব্যাংকে এ হিসাব খুলে জনসাধারণের কাছ থেকে সংগ্রহ করা অর্থ জমা রাখতে হবে। হিসাব খোলার সময় ব্যাংককে লিখিত নির্দেশনা দিতে হবে, যাতে প্রসপেক্টাসে উল্লেখ করা উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি অনুসরণ ছাড়া ওই অর্থ তোলা বা ব্যবহার করা না যায়। এর ফলে কারখানা সম্প্রসারণ, যন্ত্রপাতি কেনা কিংবা ঋণ পরিশোধের কথা বলে অর্থ সংগ্রহের পর তা অন্য খাতে ব্যবহারের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে শুধু আলাদা হিসাব চালু করলেই যে অর্থের অপব্যবহার বন্ধ হবে, তা নিশ্চিত নয়। কার্যকর নজরদারি, নিরীক্ষা এবং ঘোষিত উদ্দেশ্য অনুযায়ী অর্থ ব্যয়ের নিয়মিত যাচাইও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ঋণ পরিশোধে আইপিওর অর্থ ব্যবহারের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবটি কোম্পানির জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে, আবার বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্কতা দাবি করে। খসড়ায় বলা হয়েছে, আইপিও বা আরপিও থেকে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ অর্থ ঋণ বা বিনিয়োগ পরিশোধে ব্যবহার করা যাবে। তবে সেই ঋণ কোম্পানির কোনো প্রকল্প অথবা ভারসাম্য রক্ষা, আধুনিকায়ন, পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণের কাজে ব্যবহৃত হতে হবে এবং নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আরও শর্ত হলো, যে ঋণ পরিশোধ করা হবে, তা খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ বা পুনঃতফসিল করা চলবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে সনদ দিতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে তাতে স্বাক্ষর করতে হবে। ঋণ কমলে কোনো কোম্পানির সুদ ব্যয় ও আর্থিক চাপ কমতে পারে; তবে আইপিওর অর্থের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে গেলে নতুন কারখানা, প্রযুক্তি বা উৎপাদন সম্প্রসারণে ব্যবহারের জন্য অর্থ কমে যেতে পারে। তাই বিনিয়োগকারীদের কাছে অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা কতটা যুক্তিসংগত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
শেয়ারের দর নির্ধারণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এখন নিলামে নির্ধারিত কাট-অফ দরে শেয়ার পাওয়ার নিয়মের মধ্যে থাকলেও সংশোধনী কার্যকর হলে তারা নিজেদের দরপ্রস্তাব অনুযায়ী শেয়ার পাবেন। এ জন্য সর্বোচ্চ দর থেকে সর্বনিম্ন দর পর্যন্ত ক্রমানুসারে সব দর সাজানো হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্ধারিত শেয়ার শেষ পর্যন্ত বরাদ্দ হওয়ার পর্যায়ে কাট-অফ দর নির্ধারণ করা হবে। অন্যদিকে, নির্দিষ্ট দর পদ্ধতিতে অভিহিত মূল্যের চেয়ে বেশি দরে বা প্রিমিয়ামে শেয়ার ছাড়ার সুযোগ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। কোনো কোম্পানি প্রিমিয়ামে শেয়ার বিক্রি করতে চাইলে তাকে বুক-বিল্ডিং পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ, মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি ও বিনিয়োগকারীদের দরপ্রস্তাবকে আরও স্বচ্ছ কাঠামোয় আনার চেষ্টা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
তবে এসব পরিবর্তন এখনো কার্যকর আইন নয়। বিএসইসির প্রকাশিত খসড়ার ওপর ২ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত মতামত, পরামর্শ ও আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে। জনমত পর্যালোচনা করে কমিশন চূড়ান্ত সংশোধনী অনুমোদন ও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করলে তবেই প্রস্তাবগুলো কার্যকর হবে। ফলে আইপিওর অর্থ ব্যবহারে সীমা বৃদ্ধি, হাইব্রিড পদ্ধতিতে পুরোনো শেয়ার বিক্রি কিংবা দর নির্ধারণের নতুন নিয়ম বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ হবে, তা নির্ভর করছে চূড়ান্ত বিধিমালার ওপর।

