পুঁজিবাজারে স্বস্তি ফেরার যে আশা বিনিয়োগকারীদের ছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি। ক্ষমতার পালাবদলের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেমন বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি, তেমনি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও চিত্র বদলায়নি। এ অবস্থায় বাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার কথা ভাবছেন অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকের উচ্চ সুদহার, তারল্যসংকট এবং সুশাসন ও স্বচ্ছতার ঘাটতিই এই আস্থাহীনতার মূল কারণ।
পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি এএনএম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, গত বছরের ৫ আগস্টের আগে, পরে কিংবা বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে আশ্বাস তৈরি হয়েছিল, বাজারে তার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। তিনি নিজে তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি বিনিয়োগ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, সেই বিনিয়োগের সুফল পেতে হয়তো আরও ১০ বছর লেগে যেতে পারে। তবু তিনি আশা ছাড়ছেন না। কিন্তু পুঁজিবাজার অনেকটাই কারসাজিনির্ভর হওয়ায় আস্থার সংকট রয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শেয়ারবাজারের মূল্যসূচক বেড়ে ছয় হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। তবে এখন সেটি আবার নিম্নমুখী। লেনদেনের চিত্রও দুর্বল। একসময় দৈনিক লেনদেন দেড় হাজার কোটি টাকায় উঠলেও এখন তা নেমে এসেছে ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার ঘরে। ছোট বিনিয়োগকারীদের বাজারে ধরে রাখতে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার পরামর্শ দিচ্ছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশীদ লালী বলেন, দেশের বাণিজ্যিক অবস্থা খুব ভালো নয়, মূল্যস্ফীতিও বেশি। এমন সময়ে সাধারণ মানুষ ছোট ছোট সঞ্চয় নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে আসেন। বর্তমান পরিস্থিতি তাঁদের জন্য সত্যিই দুশ্চিন্তার।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় পুঁজিবাজারে তারল্যসংকট বাড়ছে। ব্যাংকে তুলনামূলক নিরাপদ আয় মেলায় অনেক বিনিয়োগকারী ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারবাজার থেকে সরে আসছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বাজারে কতটা অর্থ আসবে, তা নির্ধারণে সুদের হার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। এটি নির্ভর করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতির ওপর। তাঁর আশা, এবার সুদের হার না কমলেও সামনে হয়তো কমানো হবে। তখন শুষ্ক অর্থনীতির মধ্যেও পুঁজিবাজার কিছুটা হলেও ভালো করবে।
কাগজে-কলমে নানা সংস্কারের কথা বলা হলেও সুশাসন ও আস্থার সংকট কাটিয়ে বাজার কবে ঘুরে দাঁড়াবে, সেই অপেক্ষায় আছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কারসাজি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ, মানসম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং সুদহার নীতিতে স্পষ্টতা, এই তিনটি বিষয়ই বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

