পুঁজিবাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন ও সম্ভাব্য কারসাজি শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। চলতি অর্থবছরের মধ্যেই এ ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। পাশাপাশি ব্লু বন্ড, গ্রিন বন্ড, অরেঞ্জ বন্ড, সুকুক ও এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডের মতো নতুন বিনিয়োগ পণ্য চালুর উদ্যোগও চলছে। এসব পরিকল্পনার লক্ষ্য পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বিকল্প বাড়ানো, অনিয়ম শনাক্তের সক্ষমতা জোরদার করা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
সম্প্রতি বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিএসইসির কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান এসব উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাজারের লেনদেন ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য পাচ্ছেন। ফলে বাজারে অনিয়ম শনাক্ত করার পাশাপাশি ভুয়া তথ্য, পরিচয় জালিয়াতি ও ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। তবে এআই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এটি কার্যকর হলে সন্দেহজনক লেনদেনের ধরন শনাক্ত করে অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় সংকেত দিতে পারবে।
বর্তমানে বিএসইসির ‘ইনস্ট্যান্টওয়াচ’ নামের নজরদারি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ২০১২ সালের ডিসেম্বর থেকে ব্যবহৃত এই ব্যবস্থার সর্বশেষ সংস্করণ সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করে সতর্কবার্তা তৈরি করে। নতুন এআই ব্যবস্থা চালু হলে বিদ্যমান নজরদারির সঙ্গে সমন্বয় করে অস্বাভাবিক লেনদেন ও সম্ভাব্য কারসাজি শনাক্তের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। তবে কোনো লেনদেন সম্পর্কে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা তৈরি হওয়া আর কারসাজি প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। সন্দেহজনক কার্যক্রমের বিষয়ে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও আইনগত প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
বিনিয়োগ পণ্যে বৈচিত্র্য আনতেও বড় পরিকল্পনা রয়েছে বিএসইসির। কমিশনের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ৫০ হাজার কোটি টাকার গ্রিন বন্ড ইস্যুর সুযোগ তৈরি করা। এ ধরনের বন্ড থেকে পাওয়া অর্থ পরিবেশ ও জলবায়ুসংশ্লিষ্ট প্রকল্পে অর্থায়নে ব্যবহার করা যায়। এ ছাড়া ব্লু বন্ড, অরেঞ্জ বন্ড ও সুকুক চালুর পরিকল্পনার পাশাপাশি এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) জন্য বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে। ইটিএফের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা একটি তহবিলের মধ্যে থাকা একাধিক সম্পদ বা সিকিউরিটিতে বিনিয়োগের সুযোগ পেতে পারেন। কমিশনের উপস্থাপনা অনুযায়ী, ব্র্যাক ব্যাংককে তিন বছর মেয়াদি এক হাজার কোটি টাকার গ্রিন বন্ড ইস্যুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং ব্যাংকটি তা চালুও করেছে। তবে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রাটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ইতোমধ্যে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ নয়।
প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে বলে সতর্ক করেছে বিএসইসি। কমিশনার তানভীর হাবিব রহমানের মতে, এআই দিয়ে তৈরি বিশ্বাসযোগ্য দেখতে বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য, ডিপফেক ভিডিও এবং পরিচয় জালিয়াতির মাধ্যমে মানুষকে ফাঁদে ফেলা হতে পারে। প্রতারকেরা কখনো বিএসইসি বা ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে ফোন, খুদে বার্তা, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ফেসবুকে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। নিশ্চিত মুনাফার প্রতিশ্রুতি, ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানোর অনুরোধ, ভুয়া ওয়েবসাইট বা অ্যাপ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপকে সম্ভাব্য প্রতারণার লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিশন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া বিনিয়োগের বিজ্ঞাপন সরাতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সঙ্গে বিএসইসির সমঝোতা স্মারকও রয়েছে। বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও প্রস্তাবের তথ্য নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন কমিশনার।
বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় আইন প্রয়োগও জোরদার করার কথা জানিয়েছে বিএসইসি। কমিশনের উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২২৭টি আইন প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং জরিমানা করা হয়েছে ৪১৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা। একই সময়ে ১২৮টি তদন্ত ও ১৯২টি পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে। বাজার কারসাজি, অভ্যন্তরীণ তথ্য ব্যবহার করে অনৈতিক লেনদেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্যাপিটাল মার্কেট ট্রাইব্যুনাল শক্তিশালী করা ও অনিয়মের তথ্য প্রকাশকারীদের সুরক্ষায় বিধিমালা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বিএসইসির ক্যাপিটাল মার্কেট কমপ্লেইন্ট অ্যান্ড আরবিট্রেশন ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থায় গত অর্থবছরে ১৩৩টি অভিযোগ জমা পড়েছিল, যার মধ্যে ৫২টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের আর্থিক ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের অনিয়মে ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ হাজার ৩৩২ জন বিনিয়োগকারীকে বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল থেকে মোট ৭২ কোটি টাকা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। অন্যদিকে, পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণ সহজ করতে অনলাইনে বিও হিসাব খোলা, মোবাইল ট্রেডিং এবং আইপিও আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার পরিকল্পনা রয়েছে বিএসইসির। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনবোর্ডিং পোর্টাল চালু এবং স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের তালিকাভুক্তি সহজ করতে ‘ডিজিটাল আইপিও এক্সপ্রেস’ চালুর উদ্যোগও রয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, ২০২৫ সালের পাবলিক অফার বিধিমালার খসড়া সংশোধন নিয়ে কাজ চলছে এবং এ বিষয়ে ১৯ অক্টোবর মতামত আহ্বান করা হয়েছে। মার্জিন বিধিমালাও গত ১৭ আগস্ট সংশোধন করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে বাজারে সচেতন বিনিয়োগকারী বাড়াতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে পুঁজিবাজারবিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছে কমিশন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট ও বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কসের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ২৬ হাজার ৩৯২ জন অংশ নিয়েছেন বলে বিএসইসির উপস্থাপনায় জানানো হয়েছে। কমিশনের পরিকল্পনায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, নতুন আর্থিক পণ্য, বিনিয়োগকারী শিক্ষা এবং আইন প্রয়োগ একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে পরিকল্পনাগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা ধারাবাহিক থাকে এবং বিনিয়োগকারীরা কতটা কার্যকর সুরক্ষা পান, তার ওপর।

