দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ২৩টি কোম্পানি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিস্থিতি অত্যন্ত দুর্বল। কোনো কোনো কোম্পানির শেয়ারপ্রতি লোকসান ৭২ টাকারও বেশি। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মুনাফা করেও বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুটি কোম্পানি।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর এখন পর্যন্ত শতাধিক তালিকাভুক্ত কোম্পানি লভ্যাংশসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। এর মধ্যে ৮২টি কোম্পানি নগদ, বোনাস অথবা উভয় ধরনের লভ্যাংশ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। অন্যদিকে ২৩টি কোম্পানি কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
লভ্যাংশ না দেওয়ার তালিকায় রয়েছে আজিজ পাইপস, জিল বাংলা সুগার মিলস, শ্যামপুর সুগার মিলস, উসমানিয়া গ্লাস, বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস (বিবিএস), ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক (আইএসএন), ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), রহিমা ফুড করপোরেশন, স্টাইলক্রাফট, জাহিন স্পিনিং, দ্য পেনিনসুলা, চিটাগং, সাফকো স্পিনিং, এপেক্স উইভিং, দেশবন্ধু পলিমার, বসুন্ধরা পেপার মিলস, মেঘনা সিমেন্ট, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, মুন্নু অ্যাগ্রো, জুট স্পিনার্স, মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজ ও সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস।
লোকসানে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে চিনিকল ও সিমেন্ট কোম্পানি
আর্থিক ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, লোকসানের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে জিল বাংলা সুগার মিলস। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৭২ টাকা ৩২ পয়সা। অর্থাৎ প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে কোম্পানিটির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭২ টাকার বেশি।
তালিকার পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে মেঘনা সিমেন্ট। কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৬৩ টাকা ৬৮ পয়সা। শ্যামপুর সুগার মিলসের লোকসান ৪২ টাকা ৯৪ পয়সা এবং বসুন্ধরা পেপার মিলসের ৪২ টাকা ৭৪ পয়সা।
এ ছাড়া জুট স্পিনার্সের শেয়ারপ্রতি লোকসান বেড়ে ৪০ টাকা ২০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরে কোম্পানিটির এই লোকসানের পরিমাণ ছিল ৩৬ টাকা ৩২ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
লোকসানের প্রবণতা বেড়েছে রেনউইক যজ্ঞেশ্বরেরও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৭ টাকা ৭৬ পয়সা।
অন্যদিকে উসমানিয়া গ্লাসের শেয়ারপ্রতি লোকসান ৪ টাকা ৭৯ পয়সা এবং আজিজ পাইপসের ৩ টাকা ৭৭ পয়সা।
আইসিবির লোকসান কমলেও কমেছে সম্পদমূল্য
রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) আর্থিক অবস্থাতেও দুর্বলতার চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৭ টাকা ৫২ পয়সা। আগের অর্থবছরে এই লোকসানের পরিমাণ ছিল ১৪ টাকা।
অর্থাৎ লোকসানের পরিমাণ কিছুটা কমলেও কোম্পানিটির সম্পদমূল্যে অবনতি হয়েছে। আগের অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ছিল ৩৭ টাকা ৪৫ পয়সা। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ টাকা ২৬ পয়সায়।
বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমসের (বিবিএস) শেয়ারপ্রতি লোকসানও বেড়েছে। আগের অর্থবছরে যেখানে লোকসান ছিল ৫৯ পয়সা, সেখানে সর্বশেষ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯১ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি এনএভি কমে ১০ টাকা ৬৯ পয়সায় নেমেছে।
ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্কের (আইএসএন) শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৫১ পয়সা। আগের বছর এই পরিমাণ ছিল ৪৩ পয়সা। কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও কমে মাত্র ১ টাকা ৯১ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।
মুনাফা করেও লভ্যাংশ দেয়নি দুই কোম্পানি
লভ্যাংশ না দেওয়ার তালিকায় থাকা সব কোম্পানিই যে লোকসানে রয়েছে, বিষয়টি এমন নয়। বরং দুটি কোম্পানি মুনাফা করার পরও শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর মধ্যে দেশবন্ধু পলিমার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ৩ টাকা ১৫ পয়সা মুনাফা করেছে। অন্যদিকে মুন্নু অ্যাগ্রোর শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৪ পয়সা।
মুনাফা থাকা সত্ত্বেও কোম্পানি দুটি লভ্যাংশ ঘোষণা না করায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তবে কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ না দেওয়ার পেছনে পরিচালনা পর্ষদের নির্দিষ্ট আর্থিক বিবেচনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী, তা আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামল চার কোম্পানি
এদিকে টানা দুই বছর লভ্যাংশ ঘোষণা না করায় চারটি কোম্পানিকে ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোম্পানিগুলো হলো বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস, ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ এবং দেশবন্ধু পলিমার।
ডিএসইর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিবিএস ও আইএসএনকে গত ২৮ অক্টোবর থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। আইসিবির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়েছে ২৯ অক্টোবর থেকে।
স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি টানা দুই বছর লভ্যাংশ ঘোষণা না করলে সেটিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়। এ ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা মার্জিন ঋণ সুবিধা পান না। ফলে এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হয়।
বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মোট ১৭টি কোম্পানি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন করছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে এই চিত্র?
সামগ্রিকভাবে ২৩টি কোম্পানির লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরেছে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানির শেয়ারপ্রতি লোকসান ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে এবং নিট সম্পদমূল্য কমছে, সেগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
অন্যদিকে মুনাফা থাকা সত্ত্বেও লভ্যাংশ না দেওয়া কোম্পানিগুলোর সিদ্ধান্তও বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু মুনাফার হিসাব নয়, কোম্পানির নগদ প্রবাহ, ঋণের পরিমাণ, সম্পদমূল্য, ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতাও বিবেচনা করা জরুরি।
তাই কোনো কোম্পানি লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি বলেই তার শেয়ার বিনিয়োগের অনুপযোগী, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। একইভাবে শুধু মুনাফা করেছে বলে কোনো কোম্পানিকে ভালো বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করাও ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে কোম্পানির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

