দেশের বেসরকারি খাতের বৃহত্তম ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির শেয়ারদর ছয় বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ২০ টাকার নিচে নেমেছে। ক্রমবর্ধমান লোকসান, খেলাপি ঋণের চাপ এবং আর্থিক দুরবস্থার কারণে ব্যাংকটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ায় শেয়ারবাজারে এ দরপতন দেখা দিয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ব্যাংকটির শেয়ারের দাম ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে ১৯ টাকা ৫০ পয়সায় দাঁড়ায়। ২০২০ সালের পর এই প্রথম ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারদর ২০ টাকার নিচে নামল।
২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ব্যাংকটির শেয়ারদর সর্বোচ্চ ৬৪ টাকায় পৌঁছেছিল। তখন প্রথমবারের মতো ব্যাংকটির বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। তবে সোমবারের সমাপনী দর অনুযায়ী বাজারমূল্য কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৩৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ সর্বোচ্চ অবস্থানের তুলনায় প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার বাজারমূল্য হারিয়েছে ব্যাংকটি।
বড় অঙ্কের লোকসানে ব্যাংক
ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি শেয়ারদরের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে ইসলামী ব্যাংক সমন্বিত হিসাবে প্রায় ১০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের একই সময়ে ব্যাংকটি ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকার সমন্বিত লোকসান করেছে। একক হিসাবে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩০২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
বিশেষ করে চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংকটির লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৯৭০ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের বিপরীতে মুনাফা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যাংকটির দাবি, শ্রেণিকৃত বিনিয়োগের বড় অংশের কারণে বিনিয়োগ আয় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং অতীতের বড় অঙ্কের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে আমানতের পরিমাণ কমলেও আমানতকারীদের মুনাফা বাবদ ব্যয় বেড়েছে।
খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি
ব্যাংকটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও আর্থিক সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। ওই বছর শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ৪৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকায়। ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫১ শতাংশই তখন খেলাপি বা শ্রেণিকৃত ঋণে পরিণত হয়। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৪২ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
এ ছাড়া খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণেও বড় ঘাটতি রয়েছে। ব্যাংকটির প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ৫৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। কিন্তু সংরক্ষণ করা হয়েছিল মাত্র ৭ হাজার ৯২২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগে আড়াল করে রাখা এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ঋণ ও আর্থিক দায় প্রকাশ্যে আসায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৭ সালে গ্রুপটি ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।
নিয়মিত পরিচালনা পর্ষদ ছাড়াই চলছে ব্যাংক
২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছাড়াই চলছে।
বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়োগ করা একজন প্রশাসক ব্যাংকটির তদারকির দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মাধ্যমে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান লোকসান, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং প্রভিশন ঘাটতির পাশাপাশি পরিচালন কাঠামোর এই পরিবর্তনও ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

