জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বিশ্বজুড়ে এখন বিকল্প প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে বিভিন্ন দেশ। পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার খোঁজে একের পর এক উদ্ভাবন সামনে আসছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশেও এখন নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ক্ষেত্রে শুধু প্রাকৃতিক উৎস নয়, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
সম্প্রতি প্রতিবেশী ভারত এমন একটি প্রযুক্তি সামনে এনেছে, যা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশটির বেসরকারি জ্বালানি তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গ্রিনভাইজ তৈরি করেছে বিশেষ ধরনের একটি চুলা। এতে গ্যাসের পাইপলাইন বা সিলিন্ডারের প্রয়োজন হয় না। সামান্য পানি ও বিদ্যুৎ থাকলেই এটি চালানো সম্ভব। প্রতিষ্ঠানটি এর নাম দিয়েছে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে হাইড্রোজেন চুলা’।
চুলাটির কার্যপ্রণালি তুলনামূলক সহজ। এতে থাকা প্রোটোন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেন (পিইএম) ইলেকট্রোলাইজার পানিকে ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে পরিণত করে। এরপর হাইড্রোজেন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং অক্সিজেন বাতাসে মিশে যায়। পুরো প্রক্রিয়াটি চালাতে প্রয়োজন হয় বিদ্যুৎ বা ব্যাটারির সংযোগ। ফলে এটি তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইড্রোজেন জ্বালানির বড় সুবিধা হলো এটি পোড়ার সময় কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি করে না। ফলে ধোঁয়া বা দূষণও কম হয়। একই সঙ্গে কম পানি ও সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেই দীর্ঘ সময় রান্না করা সম্ভব। দাবি করা হচ্ছে, প্রায় ১০০ মিলিলিটার পানি ও এক ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত রান্না করা যায়। সৌরশক্তির সঙ্গেও এ প্রযুক্তির সমন্বয় সম্ভব হওয়ায় দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ এবং রাতে ব্যাটারি ব্যবহার করেও এটি চালানো যাবে।
তবে প্রযুক্তিটি একেবারে নতুন নয়। পানি থেকে জ্বালানি তৈরির ধারণা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬০-এর দশক থেকেই গবেষণা চলছে। সাধারণত এ ধরনের প্রযুক্তিকে ‘অক্সি-হাইড্রোজেন টর্চ’ নামে পরিচিত করা হয়। এতদিন এটি মূলত শিল্প ও বিশেষ কারিগরি কাজে ব্যবহৃত হলেও এখন ধীরে ধীরে গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী করে উন্নয়ন করা হচ্ছে।
ভারতের গ্রিনভাইজ জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য মূলত সেইসব এলাকা, যেখানে গ্যাস বা বিদ্যুতের সরবরাহ সীমিত। পাশাপাশি হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক খাতেও এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে স্বর্ণ ও কারিগরি শিল্পে এটি জ্বালানি ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস সংকট চলছে। নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে অনেক এলাকায়। এলপিজি সিলিন্ডারের দামও বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যয়ও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প জ্বালানি প্রযুক্তির দিকে মনোযোগ দেওয়া সময়ের দাবি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো খরচ। ভারতে এক স্টোভের হাইড্রোজেন চুলার দাম প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার রুপি। দুই স্টোভের সংস্করণের দাম প্রায় দেড় লাখ রুপি। যদিও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির দাবি, উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়লে ভবিষ্যতে দাম কমে আসবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ নিজস্ব প্রযুক্তিতে এ ধরনের চুলা তৈরি করতে পারলে উৎপাদন ব্যয় অনেক কমানো সম্ভব।
দেশীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ ক্ষেত্রে গবেষণায় যুক্ত করারও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ ধরনের উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার যদি গ্রিন এনার্জি খাতে গবেষণা, উদ্ভাবন ও অর্থায়নে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির চাহিদা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। বাংলাদেশ এখন থেকেই এ ধরনের উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করলে শুধু অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট মোকাবিলা নয়, ভবিষ্যতে রপ্তানি সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
সিভি/এম

