রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটককে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম দেওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। ১৫ বছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া এই স্পেকট্রামের নির্ধারিত মূল্য ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। তবে টেলিটকের দীর্ঘদিনের বিপুল বকেয়ার কারণে এই অর্থ সাধারণ নিয়মে নগদ পরিশোধের পরিবর্তে সরকারের ইক্যুইটি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ শুধু টেলিটকের জন্য নয়, দেশের পুরো মোবাইল টেলিযোগাযোগ বাজারের জন্যও। কারণ ৭০০ মেগাহার্টজকে মোবাইল নেটওয়ার্কের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান কম-ফ্রিকোয়েন্সির ব্যান্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ব্যান্ডের তরঙ্গ তুলনামূলকভাবে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে এবং ভবনের ভেতরেও ভালোভাবে পৌঁছাতে পারে। ফলে একই সংখ্যক টাওয়ার ব্যবহার করে বিস্তৃত এলাকায় নেটওয়ার্ক পৌঁছানো সম্ভব হয়। বিশেষ করে গ্রাম ও আধা-শহর এলাকায় কভারেজ বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে ৪জি ও ৫জি সেবা সম্প্রসারণে এ ধরনের স্পেকট্রামের গুরুত্ব রয়েছে।
টেলিটক যে স্পেকট্রামটি পেয়েছে, তা মূলত চলতি বছরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের নিলামে অবিক্রীত থাকা অংশের একটি বড় অংশ। ওই নিলামে মোট ২৫ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম তোলা হয়েছিল। কিন্তু গ্রামীণফোন ছাড়া অন্য কোনো অপারেটর শেষ পর্যন্ত অংশ নেয়নি। গ্রামীণফোন ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম প্রতি মেগাহার্টজ ২৩৭ কোটি টাকা ভিত্তিমূল্যে নেয়, অর্থাৎ মোট ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকায়। এরপর অবিক্রীত ১৫ মেগাহার্টজের মধ্য থেকে ১০ মেগাহার্টজ টেলিটককে দেওয়ার জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ বিটিআরসিকে নির্দেশ দেয়।
এখানেই টেলিটকের বরাদ্দের সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি তৈরি হয়েছে। গ্রামীণফোনকে প্রতিযোগিতামূলক নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্পেকট্রাম কিনতে হয়েছে। বিপরীতে টেলিটক সরাসরি সরকারি নির্দেশনায় ১০ মেগাহার্টজ পেয়েছে। তবে এর জন্য নির্ধারিত মূল্য কমানো হয়নি। প্রতি মেগাহার্টজ ২৩৭ কোটি টাকা হিসাবেই ১০ মেগাহার্টজের মূল্য দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। বিটিআরসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই অর্থের আর্থিক হিসাব টেলিটকের ওপর সরকারের ইক্যুইটি বিনিয়োগের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল স্পেকট্রাম বরাদ্দ নয়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অপারেটরের আর্থিক দায় পুনর্বিন্যাসের সঙ্গেও যুক্ত।
কারণ টেলিটকের বকেয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি নথি ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, স্পেকট্রাম ফি, লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য খাতে টেলিটকের বিটিআরসির কাছে বকেয়া প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সাধারণভাবে কোনো অপারেটরের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে বড় অঙ্কের বকেয়া থাকলে নতুন স্পেকট্রাম পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। এবার সেই সমস্যার সমাধান হিসেবে টেলিটকের বকেয়া অর্থকে সরকারের বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনার প্রক্রিয়া সামনে এসেছে।
টেলিটকের জন্য নতুন স্পেকট্রামের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের অবকাঠামোতে টেলিটকের টাওয়ারের সংখ্যা কয়েক হাজার হলেও বেসরকারি অপারেটরদের তুলনায় তাদের নেটওয়ার্কের পরিসর ও সক্ষমতা সীমিত। একই সময়ে টেলিটক ৪জি ও ৫জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। কোম্পানিটির সাম্প্রতিক দরপত্রে ২জি/৪জি নেটওয়ার্কের জন্য রেডিও অ্যাকসেস ও অ্যান্টেনা সরঞ্জাম এবং ৪জি/৫জি নেটওয়ার্কের জন্য ফিক্সড ওয়্যারলেস অ্যাকসেস সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগের তথ্যও রয়েছে।
নতুন ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম তাই টেলিটকের জন্য শুধু অতিরিক্ত তরঙ্গ নয়; সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে এটি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের খরচ ও সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। কম-ফ্রিকোয়েন্সির ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের একটি বড় সুবিধা হলো, তুলনামূলক কম সংখ্যক বেস স্টেশন দিয়ে বড় এলাকায় কভারেজ দেওয়া যায়। ফলে প্রত্যন্ত ও কম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এটি উচ্চতর ফ্রিকোয়েন্সির ব্যান্ডের তুলনায় বেশি কার্যকর হতে পারে। গ্রাহকের জন্য এর অর্থ হতে পারে উন্নত কভারেজ, বিশেষ করে ঘরের ভেতরে এবং নেটওয়ার্ক দুর্বল এমন এলাকায়।
তবে এই সিদ্ধান্তের আরেকটি দিকও রয়েছে বাজারে প্রতিযোগিতার প্রশ্ন। জানুয়ারির নিলামের আগে রবি ও বাংলালিংক ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত নিলামে অংশ নেয়নি। উচ্চ স্পেকট্রাম মূল্যসহ বিভিন্ন কারণ নিয়ে অপারেটরদের আপত্তি ছিল। এখন ২৫ মেগাহার্টজের নিলামযোগ্য অংশের ১০ মেগাহার্টজ গ্রামীণফোন এবং আরও ১০ মেগাহার্টজ টেলিটকের হাতে যাওয়ায় অবশিষ্ট থাকছে মাত্র ৫ মেগাহার্টজ। ফলে ভবিষ্যতে রবি ও বাংলালিংকের মতো বড় বেসরকারি অপারেটর এই ব্যান্ডে প্রবেশের সুযোগ কতটা পাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অবশ্য অন্য জায়গায় ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার স্পেকট্রাম বরাদ্দ পেলেই কি টেলিটকের নেটওয়ার্ক সমস্যার সমাধান হবে? উত্তরটি সরাসরি ‘হ্যাঁ’ নয়। স্পেকট্রাম হলো নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, কিন্তু এর সুফল পেতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত টাওয়ার, আধুনিক যন্ত্রপাতি, ব্যাকহল অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ। টেলিটকের সাম্প্রতিক সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ দেখাচ্ছে যে এসব ক্ষেত্রে কাজ চলছে। এখন মূল বিষয় হবে নতুন স্পেকট্রাম কত দ্রুত ও কতটা কার্যকরভাবে বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে ব্যবহার করা যায়।
বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর চলতি বছরেই প্রথম বড় অগ্রগতি হয়েছে। জানুয়ারিতে গ্রামীণফোনের মাধ্যমে ব্যান্ডটির ব্যবহার শুরু করার পথ তৈরি হয়, আর এখন টেলিটকও একই ব্যান্ডে জায়গা পেল। ফলে দেশের মোবাইল ইন্টারনেট অবকাঠামোয় একটি নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এর সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে একটি বিষয়েই বরাদ্দ করা স্পেকট্রাম কাগজে থাকবে, নাকি বাস্তবে গ্রাহকের হাতে উন্নত নেটওয়ার্ক হিসেবে পৌঁছাবে।

