বিমানবন্দরে পণ্য আসছে, কিন্তু দ্রুত ছাড়ছে না বাংলাদেশের এয়ার কার্গো ব্যবস্থায় এই পুরোনো সমস্যার সমাধানে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের কথা ভাবছে সরকার। লক্ষ্য শুধু পণ্য শনাক্তকরণ দ্রুত করা নয়; গুদাম, কাস্টমস, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও তথ্য আদান-প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সমন্বিত করার পরিকল্পনাও আলোচনায় এসেছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেছেন, বিমান চলাচল খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাংলাদেশ শুধু অনুসরণ করবে না, বরং নেতৃত্ব দেওয়ার অবস্থানে যেতে চায়। সম্প্রতি বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এআইভিত্তিক পণ্য শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, অস্থায়ী ও স্থায়ী গুদাম, ওষুধের জন্য কোল্ড স্টোরেজ এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য নীতিমালা তৈরির বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
এখানেই বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ দিকটি আছে। বিমানবন্দরে পণ্য ছাড়তে দেরি হলেই আমরা সাধারণত কাস্টমসকে দায়ী করি। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি অনেক বেশি জটিল। পণ্য আসার পর সেটি কোথায় থাকবে, কত দ্রুত স্ক্যান হবে, প্রয়োজনীয় নথি কখন পৌঁছাবে, কাস্টমস কখন মূল্যায়ন করবে, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার কখন পণ্য সরাবে এবং আমদানিকারক কখন সেটি সংগ্রহ করবেন পুরো চেইনের যেকোনো একটি জায়গায় ধীরগতি তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত কার্গো আটকে যায়।
বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক সময়ে এই সমস্যার বড় উদাহরণও দেখা গেছে। ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিমানবন্দরে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ টন কার্গো এলেও সংরক্ষণ সক্ষমতা ছিল প্রায় ১০০ টনের মতো। সপ্তাহান্তের পর জমে থাকা কার্গোর পরিমাণ ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টন পর্যন্ত পৌঁছানোর কথাও উঠে আসে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির সমস্যা। মে মাসে শাহজালাল বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো স্ক্রিনিংয়ের চারটি এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেমের মধ্যে তিনটিই অচল ছিল বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ফলে শুধু সফটওয়্যার বা এআই দিয়ে পুরো সমস্যার সমাধান করা যাবে এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
প্রস্তাবিত এআই ব্যবস্থা কার্যকর হলে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হতে পারে ঝুঁকি অনুযায়ী পণ্য আলাদা করা। অর্থাৎ প্রতিটি চালানকে একইভাবে পরীক্ষা করার বদলে পণ্যের ধরন, ঘোষিত মূল্য, আমদানিকারকের ইতিহাস, নথিপত্র ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন চালানে বেশি ঝুঁকি রয়েছে এবং কোনটি দ্রুত ছাড় দেওয়া যেতে পারে সেটি নির্ধারণে প্রযুক্তি সহায়তা করতে পারে।
এ ধরনের প্রযুক্তি আন্তর্জাতিকভাবেও নতুন নয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিকস ও মেশিন লার্নিং কাস্টমসের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অডিট এবং পণ্য ছাড়ের দক্ষতা বাড়াতে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে প্রযুক্তি বসালেই ফল পাওয়া যায় না; প্রয়োজন হয় মানসম্মত তথ্য, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং স্পষ্ট প্রযুক্তি পরিকল্পনা।
বাংলাদেশের কাস্টমস ব্যবস্থাতেও পুরোপুরি ডিজিটাল প্রক্রিয়া নেই এমন নয়। এএসওয়াইকিউডা ওয়ার্ল্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্গো ম্যানিফেস্ট ও বিভিন্ন নথি ইলেকট্রনিকভাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কাস্টমসের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, পণ্যের শুল্ক ও কর নির্ধারণের পর অর্থ পরিশোধ হলে রিলিজ অর্ডার দেওয়া হয় এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে পণ্য ছাড় করা হয়।
অর্থাৎ এখন প্রশ্ন হচ্ছে পুরোনো ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর নতুন এআই বসানো হবে, নাকি পুরো প্রক্রিয়াটাকেই নতুন করে সাজানো হবে?
সরকার ইতোমধ্যে বিমানবন্দরের বাইরে আলাদা কার্গো ভিলেজ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের মতে, বিমানবন্দরকে মূলত পণ্যের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে কাজ করা উচিত, দীর্ঘ সময়ের জন্য গুদাম হিসেবে নয়। এ জন্য অস্থায়ীভাবে সাতটি এবং স্থায়ীভাবে চারটি সম্ভাব্য স্থানে গুদাম তৈরির বিষয়ও সাম্প্রতিক বৈঠকে আলোচনায় এসেছে।
এখানে ব্যবসার হিসাবটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি পণ্য বিমানবন্দরে কয়েক দিন পড়ে থাকলে শুধু আমদানিকারকের গুদাম খরচ বাড়ে না; নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, ডেমারেজ, পরিবহন ব্যয় এবং উৎপাদন বিলম্ব সব মিলিয়ে পণ্যের প্রকৃত খরচ বেড়ে যায়। বিশেষ করে ওষুধ, খাদ্য, ফুল, কৃষিপণ্য বা অন্য সময়সংবেদনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার বিলম্বও বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এ কারণেই ওষুধের মতো সংবেদনশীল পণ্যের জন্য কোল্ড স্টোরেজ তৈরির আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানেও অবকাঠামো তৈরি করাই শেষ কথা নয়। কোন পণ্য কোথায় যাবে, তার তাপমাত্রা কীভাবে পর্যবেক্ষণ হবে, দায়িত্ব কার এবং ছাড়পত্র না পাওয়া পর্যন্ত পণ্যের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে এসব বিষয়ও একই ব্যবস্থার অংশ হতে হবে।
আরেকটি বাস্তব সমস্যা হলো সময়। জুনে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, শুক্রবার ও শনিবার সীমিত কার্যক্রমের কারণে বিমানবন্দরের কার্গো জট পুরোপুরি কমানো যাচ্ছে না। স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো ছুটির দিনেও চালু রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। এর আগে এপ্রিলেই বিমানবন্দরে ২৪ ঘণ্টা কার্গো ডেলিভারি চালুর সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
তাহলে এআই চালু করলেও যদি কোনো চালানের তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ হয়ে যায়, কিন্তু সেটি সরানোর জন্য পর্যাপ্ত জনবল না থাকে, স্ক্যানার অচল থাকে, গুদামে জায়গা না থাকে কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ছুটিতে থাকেন তাহলে প্রযুক্তির গতি বাস্তব ব্যবস্থায় এসে আটকে যাবে।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য বড় শিক্ষা হলো, কার্গো ব্যবস্থাপনার সমস্যা কোনো একক সংস্থার সমস্যা নয়। কাস্টমস পণ্যের বৈধতা, ঘোষণা, নথি ও শুল্ক-কর যাচাই করবে; বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ অবকাঠামো ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে; গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের আলাদা দায়িত্ব রয়েছে। তাই সরকারের সাম্প্রতিক বৈঠকে দায়িত্বগুলো আলাদা করে দেখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানি যত বাড়বে, বিমানপথে দ্রুত পণ্য পরিবহনের প্রয়োজনও তত বাড়বে। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের, দ্রুত নষ্ট হয় এমন এবং সময়সীমাবদ্ধ পণ্যের ক্ষেত্রে বিমানবন্দর শুধু পরিবহনের জায়গা নয় এটি সরাসরি ব্যবসার প্রতিযোগিতা সক্ষমতার অংশ।
বিশ্বব্যাংকের বাণিজ্য সহজীকরণ কার্যক্রমেও বাংলাদেশের কাস্টমস ও পণ্য ছাড়ের সময় কমানোর জন্য প্রক্রিয়া সরলীকরণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাই এআই ব্যবহারের উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর সাফল্য মাপার জায়গা হবে কোনো সফটওয়্যার চালু হয়েছে কি না, সেটি নয়। বরং একজন ব্যবসায়ী আজ যে কার্গো ছাড়াতে কয়েক দিন অপেক্ষা করছেন, ভবিষ্যতে সেটি কয়েক ঘণ্টায় ছাড়াতে পারছেন কি না সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।
কারণ শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ী এআই দেখবেন না, গুদাম দেখবেন না, কাস্টমসের সফটওয়্যারও দেখবেন না। তিনি দেখবেন তার পণ্য কত দ্রুত হাতে পৌঁছাল, কত খরচ হলো এবং সেই পণ্য নিয়ে তিনি সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারলেন কি না। বাংলাদেশের বিমান কার্গো ব্যবস্থাকে সত্যিকারের আধুনিক করতে হলে প্রযুক্তির সঙ্গে সেই পুরো অভিজ্ঞতাটাকেই বদলাতে হবে।

