বাংলাদেশে ৫জি নেটওয়ার্কের ব্যবহার এখনো সীমিত। তবে ৫জি-সমর্থিত স্মার্টফোনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বিস্তৃত হওয়ার আগেই অনেক গ্রাহক নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তির উপযোগী ফোন কিনছেন।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের তিন বড় মোবাইল অপারেটর—গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের নেটওয়ার্কে ৫জি-সমর্থিত হ্যান্ডসেটের সংখ্যা গত ১১ মাসে ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।
২০২৫ সালের আগস্টে এসব অপারেটরের নেটওয়ার্কে ৫জি-সক্ষম হ্যান্ডসেট ছিল ১ কোটি ৮ লাখের মতো। চলতি বছরের জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজারে। অর্থাৎ এক বছরেরও কম সময়ে যুক্ত হয়েছে প্রায় ৪৬ লাখ নতুন ৫জি-সমর্থিত ডিভাইস।
অন্যদিকে, একই সময়ে দেশে মোট হ্যান্ডসেটের সংখ্যা বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালের আগস্টে মোট হ্যান্ডসেট ছিল ১৭ কোটি ৫৭ লাখ ৫০ হাজারের মতো, যা জুলাইয়ে বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৭ কোটি ৭০ লাখ ২০ হাজার।
অর্থাৎ মোট ফোনের সংখ্যা খুব বেশি না বাড়লেও ৫জি-সক্ষম ফোনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে পুরোনো ফোন বদলে নতুন ডিভাইস কেনার প্রবণতাকেই দেখা হচ্ছে।
তবে বিটিআরসির এই হিসাবকে দেশে ব্যবহৃত স্বতন্ত্র ফোনের প্রকৃত সংখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অপারেটররা নিজেদের নেটওয়ার্ক অনুযায়ী হ্যান্ডসেট হিসাব করে। ফলে একই ব্যক্তি একাধিক অপারেটরের সিম ব্যবহার করলে একই ফোন একাধিকবার গণনায় আসতে পারে। উন্নত কলরেট, ডেটা অফার ও নেটওয়ার্ক কাভারেজের জন্য অনেক গ্রাহক একাধিক সিম ব্যবহার করেন।
স্মার্টফোনের ব্যবহারও বাড়ছে
জুলাইয়ে দেশে ৩জি, ৪জি ও ৫জি—সব ধরনের স্মার্টফোন মিলিয়ে মোট হ্যান্ডসেটের ৬৫ দশমিক ১৫ শতাংশ ছিল। গত বছরের আগস্টে এই হার ছিল ৬২ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, ফিচার ফোনের অংশ ৩৭ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৩৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
বিশ্বব্যাপীও ৫জি গ্রহণের হার দ্রুত বাড়ছে। এরিকসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বে ৫জি সাবস্ক্রিপশনের সংখ্যা ৩১০ কোটি ছাড়িয়েছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। তবে দেশে ৫জি-সমর্থিত ডিভাইসের সংখ্যা বাড়তে থাকা ভবিষ্যতে প্রযুক্তিটির বিস্তারের জন্য গ্রাহকদের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশের চার মোবাইল অপারেটরের মধ্যে রবি ও গ্রামীণফোন ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যিকভাবে ৫জি চালু করে। তবে দুই প্রতিষ্ঠানই এখন পর্যন্ত তাদের কতজন গ্রাহক ৫জি ব্যবহার করছেন বা কতগুলো সাইট ৫জিতে উন্নীত করা হয়েছে, সে তথ্য প্রকাশ করেনি।
৫জি প্রস্তুতিতে এগিয়ে রবি
সংখ্যার হিসাবে গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্কে সবচেয়ে বেশি ৫জি-সমর্থিত হ্যান্ডসেট রয়েছে। জুলাইয়ে এর সংখ্যা ছিল ৬১ লাখ ৯০ হাজার, যা ২০২৫ সালের আগস্টের ৪২ লাখ ৯০ হাজার থেকে ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
গ্রামীণফোনের প্রধান করপোরেট অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা তানভীর মোহাম্মদ বলেন, দেশের সব বিভাগীয় সদর দপ্তরে ৫জি সেবা চালু করা হয়েছে। তবে ডিভাইসের প্রাপ্যতা, বাস্তব ব্যবহার এবং শিল্প খাতের প্রস্তুতিসহ বাংলাদেশের সামগ্রিক ৫জি ইকোসিস্টেম এখনো গড়ে উঠছে।
তার মতে, আরও শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য ৪জি নেটওয়ার্ক ৫জির চাহিদা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গ্রামীণফোন ইতোমধ্যে ৭০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম ব্যবহার শুরু করেছে, যার মাধ্যমে নেটওয়ার্কের মান, ঘরের ভেতরের কাভারেজ এবং দেশজুড়ে সংযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে শুধু সাধারণ গ্রাহকসেবা নয়, করপোরেট ও শিল্প খাতেও ৫জির বড় সম্ভাবনা রয়েছে। চাহিদা ও প্রযুক্তির পরিবেশ আরও তৈরি হলে কাভারেজ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
তবে মোট হ্যান্ডসেটের অনুপাতে ৫জি-সমর্থিত ডিভাইসের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে রবি।
জুলাইয়ে রবির নেটওয়ার্কে ৫জি-সক্ষম হ্যান্ডসেট ছিল ৫৭ লাখ ৪০ হাজার। ২০২৫ সালের আগস্টে এই সংখ্যা ছিল ৩৯ লাখ ১০ হাজার। অর্থাৎ ১১ মাসে বেড়েছে ৪৬ দশমিক ৯ শতাংশ—তিন অপারেটরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ফলে রবির মোট হ্যান্ডসেটের ১০ দশমিক ৬ শতাংশ এখন ৫জি-সমর্থিত। গ্রামীণফোনে এই হার ৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং বাংলালিংকে ৭ দশমিক ২৯ শতাংশ।
রবি আজিয়াটার প্রধান করপোরেট ও রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা শহীদ আলম বলেন, গ্রাহকদের মধ্যে ৫জি ডিভাইস ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় তাদের নেটওয়ার্কে ৫জি ট্রাফিকও সবচেয়ে বেশি।
চাহিদা এবং ৫জি-সক্ষম ডিভাইসের সংখ্যা পর্যাপ্ত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ৫জি কাভারেজ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে রবির। এরই মধ্যে অনেক এলাকায় পূর্ণাঙ্গ ৫জি কাভারেজ রয়েছে এবং কোথাও কোথাও গতি ১০০ এমবিপিএসের বেশি বলে জানান তিনি।
তবে শুধু কাভারেজ বাড়ানো নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বা ভিডিও দেখার বাইরে ৫জির বাস্তব ব্যবহার তৈরি করাই রবির অন্যতম লক্ষ্য।
শহীদ আলমের মতে, স্থানীয় উদ্ভাবক, ডেভেলপার ও উদ্যোক্তারা দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী ৫জি-ভিত্তিক নতুন সমাধান তৈরি করতে পারেন। এতে ৫জি শুধু দ্রুতগতির নেটওয়ার্ক না হয়ে নতুন ব্যবসা, ডিজিটাল সেবা ও উদ্ভাবনের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে।
বাংলালিংকের ৫জি পরিকল্পনায় বড় শর্ত
বাংলালিংকের নেটওয়ার্কে জুলাইয়ে ৫জি-সমর্থিত হ্যান্ডসেট ছিল ২৭ লাখ ৫০ হাজার। গত বছরের আগস্টে এই সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৮০ হাজার। অর্থাৎ ১১ মাসে বেড়েছে ৪৬ দশমিক ১ শতাংশ।
বাংলালিংকের প্রধান করপোরেট ও রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা তাইমুর রহমান জানিয়েছেন, নভেম্বরের স্পেকট্রাম নবায়নের সময় দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হলে ৫জি চালুর বিষয়টি বিবেচনা করবে প্রতিষ্ঠানটি।
তার মতে, ৫জি সফলভাবে চালু করতে স্পেকট্রামের দাম কমানোর পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব নীতি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং বেশি মাত্রায় নেটওয়ার্ক শেয়ারিং প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্পেকট্রাম দামের দেশগুলোর একটিতে থেকে এবং একই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে কম গড় গ্রাহকপ্রতি আয়ের (এআরপিইউ) বাজারগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশের টেলিকম খাতের পক্ষে বড় বিনিয়োগ বহন করা কঠিন।
৫জি নেটওয়ার্ক স্থাপনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হওয়ায় এসব বিষয় সমাধান করা জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এতে একই সঙ্গে সেবার মান ও গ্রাহকের জন্য সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে বেশি চাহিদা এবং ৫জি-সক্ষম ডিভাইসের ঘনত্ব রয়েছে—এমন এলাকাগুলোতে ৫জি চালুর পরিকল্পনা করছে বাংলালিংক। পাশাপাশি শুরুতেই করপোরেট গ্রাহকদের জন্য ৫জি-ভিত্তিক বিভিন্ন সেবা তৈরির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখবে প্রতিষ্ঠানটি।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে ৫জি নেটওয়ার্কের বিস্তার এখনো সীমিত হলেও গ্রাহকদের হাতে ৫জি-সক্ষম ফোন দ্রুত বাড়ছে। ফলে নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, স্পেকট্রামের মূল্য এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের বাধাগুলো কাটাতে পারলে আগামী দিনে দেশে ৫জির ব্যবহার আরও দ্রুত বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

