যেখানে মোবাইল টাওয়ার নেই, সেখানেও এখন ফোনে সরাসরি স্যাটেলাইট সংযোগের মাধ্যমে মেসেজ পাঠানো ও সীমিত ডেটা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে। সরকার দেশের প্রথম বাণিজ্যিক ডাইরেক্ট-টু-সেল (ডিটুসি) সেবা চালুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলালিংককে। স্টারলিংকের স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সঙ্গে অংশীদারিত্বে এই সেবা চালু হবে। সংবাদ মাধ্যম টিবিএস-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ না করলেও উপযুক্ত ফোন সরাসরি স্যাটেলাইটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যোগাযোগ করতে পারবে। ফলে দেশের প্রত্যন্ত পাহাড়, চর, দ্বীপ ও সমুদ্র উপকূলের বাসিন্দা এবং জেলেরা যোগাযোগের সম্পূর্ণ নতুন সুযোগ পাবেন। অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা তৈমুর রহমান। তিনি জানান, প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ফোন মডেলের প্রয়োজন হবে এবং স্যাটেলাইট সংযোগ পেতে আকাশ পরিষ্কার দেখা যাওয়ার মতো জায়গায় থাকতে হবে।
অনুমোদন পাওয়া এই সেবার প্রথম পর্যায়ে গ্রাহকরা এসএমএস পাঠাতে এবং সীমিত পরিমাণ মোবাইল ডেটা ব্যবহার করতে পারবেন। বাংলালিংকের কর্মকর্তাদের মতে, প্রাথমিকভাবে ৪জি বা ৫জি নেটওয়ার্কের মতো উচ্চগতির ইন্টারনেট পাওয়া যাবে না। তবে পরীক্ষামূলকভাবে ওটিটি-ভিত্তিক মেসেজিং ও ওটিটি ভয়েস কল সফলভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে ধাপে ধাপে ভয়েস কল ও বিস্তৃত ডেটা সেবা চালু করা হবে। বিটিআরসির নিয়ন্ত্রক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইকবাল আহমেদ এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
স্যাটেলাইটভিত্তিক মোবাইল সেবার বাজার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সিদ্ধান্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়েছে। বিটিআরসি জানিয়েছে, স্টারলিংক সরাসরি একই ধরনের সেবা দেওয়ার জন্য আবেদন করেছিল, কিন্তু কমিশন সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি। বিটিআরসি কমিশনার ইকবাল আহমেদ বলেন, ‘আমরা টেরিটোরিয়াল নেটওয়ার্ক সেবার জন্য একটি আবেদন পেয়েছিলাম এবং অনুমোদনের পর মূলত প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এসএমএস ও ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার জন্য একটি আবেদন অনুমোদন করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের দেশের স্বার্থ এবং স্থানীয় অপারেটরদের ব্যবসা নিশ্চিত করতে চাই।’ এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশীয় মোবাইল অপারেটরদের নিয়ন্ত্রণাধীন থেকেই স্যাটেলাইট সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো, যা টেলিযোগাযোগ খাতে প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তা উভয় দিকেই প্রভাব রাখবে।
বাংলালিংক প্রথমে বাণিজ্যিক সেবা চালুর আগে বান্দরবান ও সন্দ্বীপসহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় দুই মাসের প্রুফ-অব-কনসেপ্ট (পিওসি) পরীক্ষা চালায়। এই পরীক্ষায় বিটিআরসি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তাদের সামনে এসএমএস, ওটিটি-ভিত্তিক মেসেজিং এবং ওটিটি ভয়েস কলিং প্রদর্শন করা হয়। বিটিআরসি ২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এক সভায় বাংলালিংকের বাণিজ্যিক প্রস্তাব অনুমোদন করে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর দেশব্যাপী সেবা বিস্তারের পথ তৈরি হয়। বাণিজ্যিক সেবা চালু হলে দেশজুড়ে পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের ২২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত গভীর সমুদ্রেও এই সেবার আওতা থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই সেবার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দারা। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, নদীবেষ্টিত চর, উপকূলীয় দ্বীপ এবং সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা এই সেবার মাধ্যমে টাওয়ারবিহীন যোগাযোগের সুবিধা পাবেন। বাংলালিংকের দেশজুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সঙ্গে স্যাটেলাইট সংযোগ যুক্ত হওয়ায় তুলনামূলকভাবে কম উন্নত বা সেবা-বঞ্চিত এলাকাতেও নির্ভরযোগ্যভাবে যোগাযোগ করা সহজ হবে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন মোবাইল টাওয়ার, ফাইবার-অপটিক সংযোগ কিংবা বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন ডিটুসি মৌলিক যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে। এই প্রযুক্তি এমনকি জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্যাটেলাইটভিত্তিক এই সেবার মাধ্যমে দেশে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক অর্জিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

