প্রোগ্রামিং না জেনেও নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সফটওয়্যার বা অ্যাপ তৈরি করা, ব্যবহারকারী না থাকলেও নিজে নিজে কাজ চালিয়ে যাওয়া এআই এজেন্ট, আর আলাদা অ্যাপ না খুলেই সরাসরি কোপাইলট থেকে ওয়ার্ড, এক্সেল ও পাওয়ারপয়েন্টের কাজ—এই তিন বড় সুবিধা নিয়ে কোপাইলটকে ঢেলে সাজিয়েছে মাইক্রোসফট। গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) প্রতিষ্ঠানটির অফিসিয়াল ব্লগে নতুন এই কোপাইলটের ঘোষণা দেওয়া হয়। মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা একে ‘কাজের জন্য নতুন অপারেটিং সিস্টেম’ বলে অভিহিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে সাধারণ চ্যাটভিত্তিক এআই সহকারী থেকে কোপাইলট এখন একটি পূর্ণাঙ্গ কাজের প্ল্যাটফর্মে রূপ নিচ্ছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি সংবাদমাধ্যমগুলো এই আপডেটকে মাইক্রোসফটের এআই কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
নতুন কোপাইলট অ্যাপ মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত—হোম, কোড এবং অটোপাইলট। হোম হলো নতুন কোপাইলটের শুরুর জায়গা, যেখানে চ্যাট ও কোপাইলটের আরেকটি এআই এজেন্ট ‘কোওয়ার্ক’ একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সাধারণ প্রশ্নের উত্তর, খসড়া তৈরি বা দ্রুত তথ্য খোঁজার জন্য চ্যাট ব্যবহার করা যাবে। আর একাধিক ধাপের জটিল কাজ কোওয়ার্কের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যাবে। কোপাইলটের নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করে হোম অংশটি ব্যবহারকারীকে সাম্প্রতিক কার্যক্রম দেখতে, কোপাইলট কী কী কাজে সাহায্য করতে পারে তার পরামর্শ পেতে এবং আগের কাজ যেখানে ছেড়েছিলেন সেখান থেকেই আবার শুরু করতে সহায়তা করবে। ভবিষ্যতে ব্যবহারকারীকে আলাদাভাবে চ্যাট, কোওয়ার্ক বা কোড মোড বেছে নিতে হবে না। তিনি যা করতে চান তা বললেই কোপাইলট নিজেই বুঝে নেবে কোন কাজটি চ্যাট, কোওয়ার্ক বা কোডের মাধ্যমে করা উচিত।
নতুন কোপাইলটের সবচেয়ে চমকপ্রদ সুবিধা হলো ‘কোড’। এই সুবিধার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা প্রোগ্রামিং ভাষা না জেনেও সাধারণ ভাষায় নির্দেশনা দিয়ে অ্যাপ, ড্যাশবোর্ড, ট্র্যাকার এবং স্বয়ংক্রিয় কাজের ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবেন। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি বলেন ‘আমার মাসিক খরচের হিসাব রাখার জন্য একটি ড্যাশবোর্ড তৈরি করো’, কোপাইলট তা তৈরি করে দেবে। এই সুবিধার পেছনে গিটহাব কোপাইলটে ব্যবহৃত একই প্রযুক্তি কাজে লাগানো হয়েছে। মাইক্রোসফটের এআই বিষয়ক প্রধান বিপণন কর্মকর্তা জ্যারেড স্পাতারো বলেছেন, ‘অ্যাপ তৈরি করা এখন মেমো লেখা বা বাজেট তৈরি করার মতোই একটি মৌলিক দক্ষতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’ নতুন এই সুবিধার ফলে কারিগরি জ্ঞান কম থাকা কর্মীরাও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ছোটখাটো সফটওয়্যার বা স্বয়ংক্রিয় কাজের ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবেন। মাইক্রোসফট জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফ্রন্টিয়ার প্রোগ্রামের আওতায় কোড সুবিধা চালু হবে এবং চলতি বছরেই মাইক্রোসফট ৩৬৫ প্রিমিয়াম ও প্রো গ্রাহকদের জন্য এর পূর্বরূপ উন্মুক্ত করা হবে।
কোপাইলটের নতুন ‘অটোপাইলট’ সুবিধাটি মূলত একটি স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট, যা ব্যবহারকারী কম্পিউটারের সামনে না থাকলেও নির্ধারিত কাজ চালিয়ে যেতে পারবে। এটি গত জুন মাসে মাইক্রোসফটের উন্মোচন করা ‘স্কাউট’ এআই এজেন্টের নতুন সংস্করণ। অটোপাইলটকে প্রতিষ্ঠানের একজন ‘ডিজিটাল সহকর্মী’ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টরিতে এজেন্টটির আলাদা পরিচয় থাকবে। ব্যবহারকারীরা অটোপাইলটকে একটি নাম, ভূমিকা এবং লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিতে পারবেন। এরপর এজেন্টটি প্রতিষ্ঠানের টিমস চ্যানেল, আউটলুক, চ্যাট ও ডকুমেন্টে সক্রিয় থেকে নিয়মিত কাজকর্ম সম্পাদন ও ফলো-আপ করতে পারবে। কারণ এটি ক্লাউডে চলে এবং এর নিজস্ব স্মৃতি, কম্পিউটার ও ওয়ার্কস্পেস রয়েছে। ব্যবহারকারীরা টিমস বা আউটলুকে অটোপাইলটকে সহকর্মীর মতো মেনশন করতে পারবেন। মাইক্রোসফট জানিয়েছে, অটোপাইলট চলতি মাসের শেষ দিকে ব্যক্তিগত পরীক্ষামূলক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
নতুন কোপাইলটে ওয়ার্ড, এক্সেল ও পাওয়ারপয়েন্ট সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। ফলে ব্যবহারকারীরা কোপাইলটের ভেতর থেকেই সম্পাদনযোগ্য ডকুমেন্ট, স্প্রেডশিট ও প্রেজেন্টেশন তৈরি ও হালনাগাদ করতে পারবেন। আলাদা করে অফিস অ্যাপে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। এসব ফাইলে দলের অন্য সদস্যরাও একসঙ্গে কাজ করতে পারবেন এবং পরিবর্তনগুলো মাইক্রোসফটের সংশ্লিষ্ট অফিস অ্যাপের সঙ্গে সমন্বিত থাকবে। মাইক্রোসফটের ব্লগ অনুযায়ী, পাওয়ারপয়েন্ট এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেকের নকশা ব্র্যান্ডের সঙ্গে মানিয়ে রাখে এবং স্লাইড ও ছবি দ্রুত সম্পাদনার সুযোগ দেয়। এক্সেলে কোপাইলট বা অন্য কেউ পরিবর্তন করলে কী পরিবর্তন হয়েছে এবং কেন—তা ব্যবহারকারী দেখতে পাবেন। এছাড়া মাইক্রোসফট ৩৬৫-এ ‘স্কিল’ নামে একটি সুবিধা আনা হচ্ছে, যা এক্সেলের জন্য আর্থিক দক্ষতা এবং ওয়ার্ডের জন্য আইনি দক্ষতার মতো বিশেষজ্ঞ জ্ঞান সরাসরি অ্যাপে নিয়ে আসবে।
নতুন কোপাইলটে এআই ব্যবহারের খরচ ব্যবস্থাপনার জন্যও সুবিধা যুক্ত করেছে মাইক্রোসফট। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এআই ও এআই এজেন্ট ব্যবহারের কারণে কত খরচ হচ্ছে, সে বিষয়ে সরাসরি ধারণা পাবেন। দ্রুত বাড়তে থাকা এআই ব্যবহারের কারণে প্রতিষ্ঠানের অপ্রত্যাশিত খরচের ঝুঁকি কমাতেই ‘ফিনঅপস ফর এআই’ নামের এই সুবিধা চালু করা হয়েছে। মাইক্রোসফট জানিয়েছে, সাধারণ চ্যাট, প্রশ্নোত্তর ও সারসংক্ষেপের মতো দৈনন্দিন কাজগুলো আগের মতোই ব্যবহারকারীর সাবস্ক্রিপশনের মধ্যে থাকবে। তবে কোওয়ার্ক, কোড এবং অটোপাইলটের মতো উন্নত সুবিধাগুলোর জন্য ব্যবহারভিত্তিক বিল প্রযোজ্য হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে ফিনঅপস ফর এআই ব্যবহার করে ব্যয় নীতি নির্ধারণ, কোন কোন এআই মডেল কোন গ্রুপ ব্যবহার করতে পারবে তা নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মীদের অনুরোধ ব্যবস্থাপনার কাজ করতে পারবে।
নতুন এই কোপাইলট আপডেট এমন এক সময়ে এলো যখন চ্যাটজিপিটি, ক্লড এবং জেমিনির মতো এআই সেবাগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নিজেদের সেবার পরিধি বাড়াচ্ছে। মাইক্রোসফটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ৪৫ কোটির বেশি বাণিজ্যিক অফিস ৩৬৫ সিটের মধ্যে কেবল ৭ শতাংশেরও কম গ্রাহক এআই সংযোজনটির লাইসেন্স নিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে কোপাইলটকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এবং প্রতিযোগীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে এই বড় আপডেট আনা হয়েছে। মাইক্রোসফটের এআই বিষয়ক নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট জ্যাকব আন্দ্রেয়ু স্বীকার করেছেন, অ্যাপে কোডিং যুক্ত করার অর্থ হলো কোম্পানিটি এখন গ্রাহকদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। এখন দেখার বিষয়—নতুন এই সুবিধাগুলো কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছায় এবং মাইক্রোসফটের প্রত্যাশা অনুযায়ী এটি কাজের ধরন বদলে দিতে পারে কি না।

